টিডিএন বাংলা ডেস্ক : জাতীয় ইংরেজি পত্রিকা ন্যাশনাল হেরাল্ডের অন্তর্তদন্তমূলক সাংবাদিকতায় তথ্যপ্রমাণসহ ফাঁস হয়ে গেল পশ্চিমবাংলায় ভয়ানক সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ষড়যন্ত্র। ন্যাশনাল হেরাল্ডের ২৭ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, বিজেপি, আরএসএস, হিন্দু সংহতি এবং বজরং দলের মিলিত উদ্যোগে রচিত হয়েছে দাঙ্গার পরিকল্পনা।

 

হিন্দু সংহতির এক সদস্যের ফাঁস করা তথ্যের সূত্র ধরে ন্যাশনাল হেরাল্ড নিউজ সংস্থার একটি তদন্তকারী দল বিজেপির দক্ষিণ চব্বিশ পরগণা জেলার ব্যবসায়ী সমিতির আহ্বায়ক এবং রাজ্য বিজেপির পর্যবেক্ষক সন্তোষ কুমারের সাথে যোগাযোগ করে। তদন্তের সময় সন্তোষ কুমার স্বীকার করেন যে, তারা পশ্চিম বাংলায় বিজয়া দশমীর পরের দিন সাম্প্রদায়িক হিংসা ছড়ানোর চক্রান্ত রচনা করেছেন। তিনি আরও বলেন, বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে হিংসাত্মক কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য কয়েকজন সিনিয়র নেতাদের নিয়ে একটি টিম গঠন করা হয়েছে। সন্তোষ কুমার স্বীকার করেন, সম্প্রতি তিলজলা মসজিদে আক্রমণের মূলে তাদের গ্রুপটিই ছিল। সেই মসজিদে দুদিন নামাজে আসতে বাধা দিয়েছিল তাদের দলের সদস্যরাই।

সন্তোষবাবুর মতে, এই ধরণের গুপ্ত কার্যক্রমে বিজেপির নিচু থেকে উপরের সারীর নেতাদের প্রত্যক্ষ মদত রয়েছে। তার দেওয়া বয়ান অনুযায়ী, এই গুপ্ত দলের সদস্যদের মধ্যে জেলার সাধারণ সম্পাদক থেকে শুরু করে বিজেপির মহিলা মোর্চা ইউনিট – অনেকেই এর সাথে যুক্ত। নামের তালিকায় থাকা লোকেদের সাথে কেন্দ্র ও রাজ্য বিজেপি নেতাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। গুপ্ত ঘাতকদের সাথে বিজেপির কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক কৈলাশ বিজয়বর্গীয়, স্মৃতি ইরানী এবং রুপা গাঙ্গুলীর ঘনিষ্ঠ ছবিও ন্যাশনাল হেরাল্ডের পাতায় প্রকাশিত হয়েছে।

 

 

 

 

রাজশ্রী লাহিড়ীর সাথে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী স্মৃতি ইরানী

 

রাজশ্রী লাহিড়ী এবং সুরজ কুমার সিংহ বিজেপি সাংসদ রুপা গাঙ্গুলির সাথে

 

রাজেশ জৈন সুরানার সাথে কৈলাশ বিজয় বর্গীয়। এই ব্যাক্তির নামও সন্তোষ জানিয়েছেন।

সন্তোষ কুমারের দেওয়া নামের তালিকায় এই গুপ্ত দলের অন্যতম সদস্য রাজশ্রী লাহিড়ীর ছবি রয়েছে স্মৃতি ইরানীর সঙ্গে। আরেকজন সদস্য রাজেশ জৈন সুরানার ছবি রয়েছে কৈলাশ বিজয়বর্গীয়ের সাথে। রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দের সাথে ছবি রয়েছে গুপ্তদলের সদস্যা সাবিতা চৌধুরীর। এবং রাজ্যপাল কেশরীনাথ ত্রিপাঠীর সাথে গুপ্তদলের অন্যতম সদস্যা রশ্মি গান্ধীর ছবি সামনে এসেছে।

সন্তোষ কুমার আরও দাবি করেছেন যে, এইসব ধ্বংসাত্বক কাজের বিষয়ে বিজেপির রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ ভালভাবেই অবগত আছেন। তিনি বলেন যে, ‘আমি দিলীপ ঘোষকে পশ্চিমবঙ্গে অস্ত্র কারখানা তৈরী ও সেইসাথে মন্দিরগুলিতে কিভাবে গোমাংস ফেলে উত্তেজনা তৈরী করা যায় তার নীল নকশা জমা দিয়েছি।

সবিতা চৌধুরী ও রাষ্ট্রপতি রাম নাথ কবিন্দ। সবিতার নামও তাদের টিমে আছে বলে সন্তোষ জানিয়েছেন

 

 

রশ্মি গান্ধীকে দেখা যাচ্ছে পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল কেশরীনাথ ত্রিপাঠীর সাথে

কিন্তু তিনি যখন জেলা সভাপতি অভিজিত দাসের সাথে এই পরিকল্পনার কথা আলোচনা করেন, তখন জেলা সভাপতি তাকে বলেন- তিনি কেন এই কাজ করবেন? এটা তো আর এস এসের কাজ। এই পরিপ্রেক্ষিতে সন্তোষবাবু, কোন এক ‘রাজনাথজী’কে চিঠি লেখেন। অনেকেই বলছেন, সন্তোষ কুমার উল্লেখিত ‘রাজনাথজী’ আসলে দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং।

ন্যাশনাল হেরাল্ড এ প্রকাশিত রিপোর্ট অনুযায়ী, সন্তোষবাবু বলেন, রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তের লোকজনকে এই গুপ্ত দলে নিয়োগ করা হয়েছে এবং লজিস্টিক যোগান দেয় আর এস এস এবং বজরং দল। সন্তোষের কথায় এই দলের ৮-১০ জন সদস্য এদের কাছ থেকে বন্দুক চালানো ও দুর্গাপূজার সময় হিংসা ছড়ানোর ট্রেনিং নেয়। বিজেপির বাংলা প্রদেশের কিছু গুরুত্বপূর্ন সদস্যসহ দক্ষিন চব্বিশ পরগনা জেলার ৪০০ জন সদস্য এই গুপ্ত দলের সঙ্গে যুক্ত আছে।

সন্তোষ কুমারের করা নামের তালিকায় যাদের নাম আছে- অর্নব মিত্র, সুরোজ কুমার সিংহ, রাজেশ জৈন সুরানা, রশ্মি গান্ধী, সাবিতা চৌধুরি, রাজা বোস, রাজশ্রী লাহিড়ী, গৌরব বিশ্বাস, সুশীল সিংঘাম, ভগবান ঝা, প্রদীপ শর্মা, তাপস পাল, শিবশঙ্কর ভট্ট, নিমাই শাহা, সুনীল দিবেদী, মনোহর পাঠক, সুভাষ শা, মন্টি, প্রবীর।

সন্তোষবাবুর দেওয়া বয়ান অনুযায়ী, তাদের কাছে এখন বিহার থেকে স্মাগ্লিং করে আনা দেশীয় বন্দুক আর বোমা মজুদ রয়েছে। তিনি দাবী করেছেন, যখন যেখানে বোমার প্রয়োজন হবে তা অনায়াসে পাওয়া যাবে। সুভাষ, রাজা, মন্টি, নিমাই সুশীল অতি সহজেই বোমার জোগান দিতে সক্ষম। উল্লেখ্য, সন্তোষ কুমার নিজের ফেসবুক ওয়ালে বন্দুক নিয়ে একাধিক ছবি পোষ্ট করেছেন। বোমার কথা জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, এগুলো আমরা নিজেদের বাড়িতে রাখিনা।

ন্যাশনাল হেরাল্ডের রিপোর্ট অনুযায়ী, রাজ্যের নিরাপত্তা ভয়ানক হুমকির মুখে। এক্ষেত্রে রাজ্য প্রশাসন সক্রিয় ভূমিকা পালন না করলে, রাজ্যের আইনশৃঙ্খলার পরিস্থিতি অবনতি হতে বাধ্য। ওয়াকিবহাল ব্যক্তিদের মতে, একই দিনে দুর্গা পূজার ভাসান এবং মহরম বিষয়ক হাইকোর্টের রায়ে বিজেপি, আর এস এস, হিন্দু সংহতির উল্লাসের কারণ- তারা ভাসান এবং মহরমকে কেন্দ্র করে দাঙ্গা বাধানোর মোক্ষম সুযোগ পেয়েছে। এইভাবে বিজেপি একটা অবিজেপি শাসিত সম্প্রীতির রাজ্যে ক্ষমতার জন্য সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাঁধানোর ষড়যন্ত্র করে যাচ্ছে।

(এই প্রতিবেদনটি বিখ্যাত ন্যাশনাল হেরাল্ড এ প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি। প্রকাশিত ছবিও সেখান থেকে নেওয়া। টিডিএন বাংলার পক্ষ থেকে এর সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।)