নিজস্ব সংবাদদাতা, টিডিএন বাংলা, কলকাতা : কল সেন্টারের নামে চলছিল কুচক্রীদের আকাম কুকাম। ব্যাঙের ছাতার মতো শহরের যত্রতত্র গজিয়ে ওঠা কল সেন্টারগুলির উপর নিয়মিত নজরদারি চালিয়ে আসছে কলকাতা পুলিশের ডিটেক্টিভ ডিপার্টমেন্ট। এদের অধিকাংশের কাজকর্মই ধোঁয়াশায় ঘেরা, অস্বচ্ছ। কল সেন্টারের নেপথ্যে সাইবার-জালিয়াতির একাধিক চক্র ধরাও পড়েছে সাম্প্রতিক অতীতে।
এইবার তেমনই আরেকটি চক্রের পর্দাফাঁস হল গত পরশু। অপরাধীরা বেশ করিৎকর্মা, কলকাতায় বসে হাজার হাজার ডলার দিব্যি হাতিয়ে নিচ্ছিল সুদূর মার্কিন মুলুক থেকে। নিজেদের সফলতার কথা কলকাতা পুকিশের ফেসবুক পেজে পাবলিশ করা হয়েছে। সেখানে এই কুচক্রের ধরা পড়ার বিস্তারিত কথা জানিয়েছে কলকাতা পুলিশ।
এন্টালির সুরেশ সরকার রোডে ছিমছাম কর্পোরেট ধাঁচের অফিস। চার যুবক সারাক্ষণ শশব্যস্ত, হয় ফোনে, নয় keyboard-এ। চতুর্দিকে ল্যাপটপ আর ডেস্কটপ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে। Modus operandi বা অপরাধ-পদ্ধতি ছিল এইরকম।
VOIP ( Voice over internet protocol) এবং Skype-এর মাধ্যমে ফোন যেত মার্কিন নাগরিকদের কাছে। অনেকেই অবহিত আছেন, এই ধরনের কল-এ যিনি ফোন করছেন, তাঁর অবস্থান আন্দাজ করা যায় না। কুচক্রী চারমূর্তি শুধু প্রযুক্তিপটুই নয়, মার্কিন ধাঁচের ইংরেজি উচ্চারণও রপ্ত করেছিল দিনের পর দিন, মাসের পর মাস হলিউডি ছবি দেখে, যাতে বিশ্বাসযোগ্যতা এতটুকু টোল না খায়।

 

 
ফোনে এরা নিজেদের পরিচয় দিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এমন একটি বিখ্যাত তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থার প্রতিনিধি হিসেবে, যাঁদের তৈরি anti-virus সফটওয়্যার নিজেদের কম্পিউটারে ব্যবহার করেন অসংখ্য মানুষ। খুবই পেশাদারি ভঙ্গিতে মার্কিনি ইংরেজিতে জানাতো, “দুঃখিত, আমাদের সিস্টেমে প্রযুক্তিগত ত্রুটি ধরা পড়েছে, আমাদের পরিষেবা ব্যাহত হয়েছে সাময়িক। অনুগ্রহ করে কম্পিউটার খুলুন এবং আমাদের নির্দেশমতো কয়েকটি সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নিন এখনই। নয়তো কম্পিউটারে মজুত সমস্ত তথ্য হারিয়ে যেতে পারে যে কোনও সময়।”
কেউ বিশ্বাস করতেন, কেউ করতেন না। মনে হতেই পারে, এতো সহজে কাউকে বোকা বানানো যায় ? যায়, যদি বলার ভঙ্গিটি সত্যিই বিশ্বাসযোগ্য হয় এবং প্রতারকরা হয় যথেষ্ট প্রযুক্তি-পারদর্শী। পঞ্চাশটা ঢিলের মধ্যে গোটা কুড়ি কিন্তু লক্ষ্যভেদ করতোই। চমকপ্রদ শোনালেও সত্যি, গ্রাহকের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া অনুযায়ী আট-দশ রকম স্ক্রিপ্ট ঠোঁটস্থ থাকতো এদের।
কম্পিউটার খুললেই Teamviewer নামক সফটওয়্যারের মাধ্যমে ” টার্গেট ” কম্পিউটারের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিত অপরাধীরা। টেকনিক্যাল খুঁটিনাটির বিস্তারে না গিয়েও বলা যায় , অবধারিত আতঙ্ক ছড়াতো গ্রাহকের মনে , হ্যাক হয়ে গেল নাকি ? এই আতঙ্কেরই সুযোগ নিয়ে এরপর পরিত্রাণের পথ দেখানো, নতুন anti-virus ব্যবহার করার প্রস্তাব , western union-এর মাধ্যমে ডলার জমা করার নির্দেশ নির্দিষ্ট অ্যাকাউন্টে। জমা হওয়ার পরই যথারীতি গ্রাহকের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন।
অপরাধীরা ধরা পড়েছে সাইবার সেল-এর হাতে। সলমান তারিক , মহম্মদ জাহিদ , শেখ শাহরুখ এবং জুনেদ খান। তালতলা-বেনিয়াপুকুর অঞ্চলের বাসিন্দা। বাজেয়াপ্ত হয়েছে একাধিক কম্পিউটার, মোবাইল ফোন এবং আরও নানাবিধ যন্ত্রাংশ।
কলকাতা পুলিশ জানায়, প্রতিদিন বদলাচ্ছে সাইবার-অপরাধের চরিত্র, সতর্ক থাকুন।