টিডিএন বাংলা ডেস্ক, লিখছেন উপন্যাসিক এবং নাট্যকার শৈবাল দাশগুপ্ত, সৌজন্যে – ন্যাশনাল হেরাল্ড : (ন্যশনাল হেরল্ডের সাংবাদিক শৈবাল দাসগুপ্ত যিনি শৈবাল মজুমদার নাম নিয়ে আর এস এস-এর একজন প্রচারক হিসেবে যুক্ত হয়ে ছয়মাস কাজ করেছেলিনে বাংলা আর এস এস-এর সাথে। উপস্থিত ছিলেন আর এস এস-এর বিভিন্ন গোপন বৈঠকে। এরপর তিনি বিভিন্ন তথ্যপ্রমাণ জোগাড় করে ফিরে এসেছেন নিজের কর্মক্ষেত্রে। সেই তথ্যপ্রমাণ সম্বলিত প্রবন্ধ লিখেছেন আজকের ন্যাশনাল হেরল্ডের ডিজিট্যাল পাব্লিকেশনে।)

 

 


প্রথম পর্বের পর থেকে –
বিশেষ সন্ধিক্ষণটা ছিল যখন আমি কলকাতায় অনুষ্ঠিত ‘বিশ্ব আয়ুর্বেদ কংগ্রেস ২০১৬‘ তে একজন ভলেন্টিয়ার হিসাবে উদ্দ্যোক্তাদের সাহায্য করছিলাম। ওই পাঁচটা দিন আমার কাছে ছিল আমার জ্ঞান চোখ খোলার দিন।

অনুষ্ঠান শুরুর আগের দিন আমাকে সল্ট লেকের National Research Institute of Ayurvedic Drug Development (NRIADD) এ নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। আর এস এস থেকে যেসব বন্ধুরা আমাকে নিতে এসেছিল তারা খুব গর্ব করেই বলছিল যে ডাইরেক্টর বলেছেন যে বিজনানা ভারতীর কাছ থেকে কোন অনিশ্চিত শর্ত সাপেক্ষে অর্ডার নেওয়ার প্রয়োজন নাই। তারা তৃপ্তির হাসি হেসে বলছিল, “কেন্দ্রে এখন আমাদের সরকার আছে।” প্রতিষ্ঠানকে বাধ্য করা হয়েছে তার ক্যাম্পাসের মধ্যে আর এস এস সহযোগীদের একটা ঘর দেওয়ার জন্য। আমি সেখানে গিয়ে দেখলাম সত্যিই অ্যাএডমিনিস্ট্রেটিভ ব্লকের একটি ঘর বিজনানা ভারতী দখল করে আছে।

তারপরে আমরা সাইন্সসিটিতে গেলাম তখন সেখানে প্রস্তুতি চলছিল। আমাকে আনন্দ পান্ডে নামক একজন আর এস এসের সিনিয়র সদস্যের সাথে পরিচয় করানো হলো। যে নাকি দুধের ব্যবসার উপর নির্ভর করে বেঁচে আছে। আমি যথেষ্ট মুগ্ধ হয়ে দেখার চেষ্টা করলাম। এমনকি কৌতুহলি হয়ে বিস্মিতভাবে জানতে চাইলাম সে কিভাবে এই কাজে টিকে আছে। যাইহোক পান্ডে এক সুদর্শন পুরুষ সামনে উপস্থিত হলেন।ভতিনি বললেন যে তিনি সবার সমানাধিকারে বিশ্বাস করেন। তাঁকে দেখে মনে হল যে তিনি যেন খোলা মনের মানুষ।

প্রতিটি ক্ষেত্রেই সেখানে একজন ইংরেজি বক্তার অভাব ছিল। এবং NASYA‘র ডঃ অর্ক জানা আমাকে আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিদের আপ্রায়নের জন্য তাকে দেওয়া গ্রুপ ওয়ার্কের জন্য আমাকে আমন্ত্রন দিলেন। আমার ইংরেজি খুব সাবলীল ছিল কিন্তু আমি সাধারণ পোশাকে ছিলাম। পূজা সাবরওয়াল ব্যাজ পরিহিতা এক মহিলা এসে আমাদের ফরম্যাল পোশাক পরার কড়া আদেশ দিলেন এবং টাই পরার সিদ্ধান্ত শুনিয়ে চলে গেলেন। পুরুষদের মধ্য থেকে একজন রসিকতা করে বললেন কলকাতার আবহাওয়া ফরম্যাল পোশাক পরার সহায়ক নয়। ডঃ জানা বাঙালীর পোশাক পরার পরামর্শ দিলেন। আমরা হাসাহাসি করতে লাগলাম। কর্মকর্তা জিজ্ঞেস করলেন ‘কোন বাঙালীপনা,’ আপনারা কি চপ্পল পরে আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিদের অভ্যর্থনা জানাতে যাচ্ছেন?
সবাই হাসতে লাগলেন এবং বললেন বাঙালীরা সব জায়গায় চপ্পল পরেই যায়। তিনি বললেন এখানে উচ্চ নীচ সবাই চপ্পল পরেই ঘোরে।

রোহিত ভেমুলার কথা আমার মনে পড়ে গেল। আমার বাঙালী পরিচয় দেখে লোকেরা আমাকে খাটো করে দেখলো। গ্রুপের সব বাঙালীরা মুখে মৃদু হাসি নিয়ে করে চুপ করে গেলাম। আমাদের পোশাক, চলন বলনের জন্য তিরস্কৃত করা হল। এবং অপমানটা কমপক্ষে পাঁচজন সিনিয়র বাঙালী সংঘের সদস্যের সামনেই করা হল।
প্রোগ্রাম চলাকালীন আমি কয়েকজন কমবয়সী যারা মোহন ভগবতের সঙ্গে সরাসরি স্বাক্ষাত করেছে তাদের মধ্যে একজন দেবেশ পান্ডের সঙ্গে স্বাক্ষাত করলাম।
তিনি আমাকে ব্যাখা করে বোঝালেন কেন একজন মানুষ বাঙালী অথবা হিন্দু হয়। বাঙালীর সংস্কৃতি কোন সংস্কৃতিই নয়, এটা বিকলাঙ্গ। তিনি আরো যোগ করলেন যে, মাত্র ১০শতাংশ বাঙালী হিন্দু ‘আসল হিন্দু’। বিজেপি আর এস এস’দের মধ্যে (বাঙালী সহ) একটা বদ্ধ ধারনা আছে যে বাংলা ভাষী হিন্দুদের চেয়ে হিন্দিভাষী হিন্দুরা অনেক শ্রেয়। এটা আমার কাছে খুব সমস্যার ছিল। কিন্তু যেহেতু আমি আর এস এসের সঙ্গে দীর্ঘদিন কাটিয়েছি তাই বুঝতে পেরেছিলাম। বাঙালী বিজেপির জন্য দুটো বিকল্প আছে হয় তাদেরকে হিন্দিভাষী হিন্দুদের উত্তম ভাবতে হবে নয়তো নিজেদের অধম মনে করতে হবে। যেমন রমেশ রায়, বিজেপির সিনিয়র কার্যনির্বাহক, উমেশ রায়ের ভাই, পশ্চিমবঙ্গ BJYM’র সহ সভাপতি শুধু হিন্দিভাষী বলে রাজ্য বিজেপির উপর তলার সঙ্গে যথেষ্ট দহরম-মহরম।
উদ্দ্যোক্তাদের দুজন যেমনটা বলছিলেন যে বাঙালীদের সেভাবে কোন গুরুত্বপূর্ণ দ্বায়ীত্ব দেওয়া হয় না। অনু্ষ্ঠান চলাকালীন অনেক স্টলই খালি পড়ে ছিল। তারা গ্রাম্য অনেক আয়ুর্বেদ ব্যবসায়ীদের আমন্ত্রন ও করেছিলেন যারা সবাই অবহেলিত শ্রেণী থেকে এসেছিল। তাদেরকে মেঝেতে বসতে দিয়েছিল। আর যাদের আয়ুর্বেদ ব্যবসার সাথে কোন সম্পর্কই ছিলনা কিন্তু ডানপন্থী আর এস এসের লোক ছিল তাদেরকে স্টলে বসতে দেওয়া হয়েছিল। এই ভেদাভেদ ছিল চরম লজ্জাজনক।
(বাকি আগামী পর্বে)

(এই লেখায় প্রকাশিত বক্তব্য বিখ্যাত ন্যাশনাল হেরাল্ড এর। প্রকাশিত ছবিও সেখান থেকে নেওয়া। টিডিএন বাংলার পক্ষ থেকে এর সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।)