সামাউল্লাহ মল্লিক, টিডিএন বাংলা, কলকাতা : দেশজুড়ে চলমান অশান্ত পরিবেশে শান্তির বার্তা দিতে ‘সেভ ডেমোক্রেসি – সেভ সেকুলারিজম’ শিরোণামে একটি সর্ব ধর্ম আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হল। কলকাতার কলাকুঞ্জ প্রেক্ষাগৃহে রবিবার বেলা ১১টা নাগাদ এই অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। এদিনের অনুষ্ঠানের মূল থিম ছিল ‘ধর্ম অনেক – লক্ষ্য এক।’ ইন্ডিয়াল প্লুরালিজম ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে এই সর্ব ধর্ম আলোচনা সভাটির আয়োজন করা হয়েছিল।


এদিনের সভার প্রধান অতিথি ছিলেন ড. রাম পুনিয়ানী। তিনি বলেন, এখন ইসলামের সঙ্গে সন্ত্রাস জুড়ে দিয়ে নেগেটিভ প্রচার চালানো হচ্ছে। রাজনৈতিক উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্যই এই কাজ করা হচ্ছে। দেশে বিজেপি ও আরএসএস বিভেদ তৈরীর কাজ করছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় যেভাবে মুসলিম, হিন্দু, শিখ, খ্রীষ্টান এক হয়ে ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিল ঠিক সেভাবেই দেশবাসীকে এক হয়ে থাকার আহ্বান জানান রাম পুনিয়ানী। বৌদ্ধ সন্ন্যাসী ড. অরুনজ্যোতি ভিক্কু বলেন, ‘আমাদের পরিচয় হওয়া উচিত মানবতার পরিচয়। ধর্মের আগে আআমাদের পরিচয় আমরা ভারতীয়। কিন্তু এ কোন ভারতে আমরা বাস করছি, যেখানে বিচারপতিরাই শীর্ষ আদালতের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তুলছেন? আজ আমরা নিজের মাকে সম্মান না করে ভারত মাতাকে সম্মান করছি। পিকে সিনেমা দেখুন। ধর্মের স্বারতত্ব এই সিনেমাই পাবেন। আমরা ধর্মের নামে ব্যবসা করছি। আমার গেরুয়া বসনে প্রমানিত হয়না আমি কতটা মানুষ।’ আমরা দিন দিন হিংসুটে হয় পড়ছি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

মুসলিম পারসোনাল ল’ বোর্ডের অন্যতম সদস্য মো. আবু তালেব রেহমানি বলেন, ‘১৯৪৭ সালে দুর্ভাগ্যক্রমে দেশভাগ হয়েছিল, আর আজ ইচ্ছাকৃতভাবে মনের ভাগ করা হচ্ছে। আমরা আমাদের লিমিট ভুলে যাচ্ছি। একজন সাধারণ চাপরাশি ও প্রধান সেবককেও লিমিটে থাকা উচিত।’ তিনিও চার বিচারপতির বিরুদ্ধাচরণের কথা তুলে ধরে বলেন, ‘শীর্ষ আদালতের বিচারপতিরাই বিচারব্যবস্থার বিরুদ্ধে আঙুল তুলছেন। তাহলে বুঝতে অসুবিধা থাকার কথা নয় যে, দেশ কোনদিকে ধাবিত হচ্ছে। আজ শুধু ধর্মের রাজনীতি চলছে। ধর্মের কথা বাদ দিন দেশের কথা বলুন। সন্ত্রাসীর বোমায় কত লোক মরে, এক্সিডেন্ট কত হাজার হাজার লোক মরছে।’ এদিনের সভায় তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, ‘শুধুমাত্র মুসলমানরাই ডেমোক্রেসি বাচানোর ঠেকা নিয়ে রেখেছে। কই বৃন্দাবন থেকে তো কোনওদিন সেভ ডেমোক্রেসি ডাক দেওয়া হয়না? আমাকে আমন্ত্রন করা হোক, আমরা সেখানে আলোচনা সভা করব।’ তিনি আরও বলেন, ‘মন্দির মসজিদ ছাড়ুন আসুন বিশ্বের সবথেকে বড় গণতন্ত্রের মন্দিরের রক্ষা করি। আজ কে কি খাবে তার বিচার করার জন্য চোরের মতো লোকের হাড়ি শুঁকে দেখা হচ্ছে।’

সেন্ট জেভিয়ার্সের ফাদার মারটিন পি বলেন, ‘আমরা সকলেই ভারতীয়। আমাদের অধিকার রয়েছে আমরা একসাথে বসব, আলাপ আলোচনা করব এবং সংঘবদ্ধভাবে এই দেশকে মজবুত করে গড়ে তুলব। এই দেশ কোনও এক বিশেষ ধর্মের মানুষের না। এই দেশ সবার।’ তিনি আরও বলেন, ‘নিজেকে ভাপবাসার মতো আমাদের প্রতিবেশীকেও ভালোবাসতে হবে। বর্তমান সময়ের নোংরা রাজনীতি আমাদের এই ভালোবাসা নষ্ট করে দিচ্ছে। তারা আমাদের মাঝে বিভেদের বেড়াজালা তৈরী করার জন্য নানা দুষ্কর্ম করে চলেছে। ইশ্বর ভয় যাদের মধ্যে আছে তারা দুষ্কর্ম করতে পারেনা।’ দেশের শাষনব্যনস্থার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আমরা তাকেই দোষারোপ করছি যাকে আমরা নিজেরাই নির্বাচিত করেছি। ভুল মানুষকে বসিয়ে তার ভুল কাজের সমালোচনা করার অধিকার আমাদের নেই।’ তার কথায়, আগে ইংরেজরা আমাদের বিভিন্ন ধর্মের ভিত্তিতে আলাদা করতে চেয়েছিল আর আজ করছে কিছু বিভেদকামী শক্তি। এই সভায় তিনি সমস্ত দেশবাসীকে এক হয়ে থাকার আহ্বান জানান।


গুরুদ্বারা সান্ত কুটিয়ার সদস্য তারসেম সিং এই সভায় গুরু নানকের সর্ব ধর্ম প্রীতির কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘গুরু নানক ধর্ম ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন। তিনি সবসময় একজন মুসলিম সাথী নিয়ে ঘুরতেন। প্রায় ৫০ বছর তার সঙ্গে ছিলেন ভাই মরদানা নামের ওই মুসলিম সাথী।’ তিনি আরও বলেন, ‘পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ মানুষ হওয়ার শিক্ষা দেয়। সেই ইসলাম ধর্মকে আজ বদনাম করা হচ্ছে।’ এই সভার বিশেষ অতিথি ১৯ বছর বয়সী ওয়ালি রেহমানি বলেন, ‘সেক্যলারিজম মরতে বসেছে। তাই এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। ধর্মের ভিত্তিতে দেশের স্বাধীনতা আন্দোলন স্তিমিত করার চেষ্টা হয়েছিল। আজও সেই চেষ্টা অব্যাহত।’ এদিন তিনি দেশের স্বাধীনতা ইতিহাসের কথা তুলে ধরেন। প্রকৃত অর্থে ‘সবকা সাথ – সাবকা বিকাশ’ এর আহ্বান জানান তিনি। এদিনের সভায় অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন, স্বামী সোমানন্দ জি মহারাজ, সভার কনভেনর রউফ আসলাম, কলকাতার জৈন এম্বাসেডর প্রবীণ বৈধ প্রমুখ।