সামু শেখ, টিডিএন বাংলা, হাওড়া: নবান্ন, স্টেট সেক্রেটারিয়েট অফ ওয়েস্ট বেঙ্গল, রাজ্যের মুখ্য প্রশাসনিক কার্যালয় থেকে মাত্র ১ কিলোমিটারের মধ্যে চুড়ান্ত যানজট বিড়ম্বনা স্বীকারের একটি অতি ব্যাস্ততম গুরুত্বপূর্ণ রাস্তার নাম হাওড়া আন্দুল রোড। হাওড়া আন্দুল রোড প্রায় ৪-৫ কিলোমিটার বিস্তীর্ণ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও অতীব ব্যাস্তময় একটি রাস্তা, যা ন্যাশনাল হাই ওয়ে NH 6 ও NH 2 এবং দেশের মেজর হাইওয়ে NH 16 এর সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত। অপরদিকে দ্বিতীয় হুগলী সেতুর সাথে সরাসরি যুক্ত, যা কলকাতা মহানগরী, ২৪ পরগণা উঃ ও দক্ষিণ, বারাসাত, নদীয়া প্রভৃতি জেলাগুলিতে যাতায়াতের একমাত্র সড়ক পথ সমগ্র হাওড়া বাসির কাছে। দেশের পূর্ব ও দক্ষিণ পূর্ব রেলওয়ের প্রাচীন হাওড়া স্টেশন প্রত্যক্ষ ভাবে যুক্ত এই আন্দুল রোডের সাথে। এ হেনো রাস্তার উপর অবস্থান করছে জেলার তথা রাজ্যের তথা দেশের বিখ্যাত বি ই ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, রাজ্যের পেট্রোল ও ডিজেল সরবরাহের বিখ্যাত প্রতিষ্ঠান ইন্ডিয়ান অয়েল করপোরেশন লিমিটেড। এই রোডের ওপর অবস্থান করছে দেশের বিখ্যাত আচার্য জগদীশ চন্দ্র বোস ইন্ডিয়ান বোটানিক্যাল গার্ডেন। রয়েছে নামজাদা সুপারস্পেশালইটি নারায়না হসপিটাল, ওয়েস্টব্যাংক হসপিটাল ,হাওড়া জেলার স্বনামধন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দীনবন্ধু কলেজ, প্রভু জগৎবন্ধু কলেজ, অক্সফোর্ড হাই স্কুল ইত্যাদি ইত্যাদি।

২০১১ সালের জনগণনা অনুযায়ী হাওড়া জেলার জনসংখ্যা ছিলো ১,০৭২,১৬১জন। শিল্প সমৃদ্ধি সুলভ অবস্থানের জন্য প্রতি বছর ০.৫৫ মিলিয়ন হারে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে হাওড়া জেলায়। পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০১২ সালে ১.১৩ মিলিয়ন, ২০১৩ সালে ১.২৬ মিলিয়ন, ২০১৪ সালে ১.৩৪ মিলিয়ন, ২০১৫ সালে ১.৪৯ মিলিয়ন, ২০১৬ সালে ১.৬৮ মিলিয়ন এবং ২০১৭ সালে গণনা অনুযায়ী ১.৭৯ মিলিয়ন অর্থাৎ জনসংখ্যা বৃদ্ধি জনবিস্ফোরণ আকার ধারণ করেছে। আন্দুল রোড পার্শ্ববর্তী এলাকা যথা আমতলা ফাঁড়ি, দানেশ শেখ লেন, বকুলতলা, চুনাভাটি, মৌড়িগ্রাম, আন্দুল, আলমপুর প্রভৃতি এলাকা অতিঘনবসতিপূর্ন। প্রতি স্কোয়ার কিলোমিটারে ৩৩০০ জনমানুষের বসবাস। এই সকল এলাকা জনঘনত্বে চূড়ান্ত সীমা অতিক্রম করেছে। সমগ্র রাজ্যবাসীর যাতায়াত পরিক্রমার একটি বিশেষ সড়ক মাধ্যম হচ্ছে এই আন্দুল রোড। প্রতিদিন প্রতিনিয়ত এই রাস্তা যানজটে অবরুদ্ধ হয়ে থাকে। অধিকাংশ সময়ই ট্রাফিক ব্যাবস্থা সাসপেন্ডেড অবস্থার মুখোমুখি হয়। সাধারণ মানুষের গন্তব্য স্থলে পৌঁছাতে নাভিশ্বাস ওঠার সামিল। একই রাস্তার উপর দিয়ে ছুটছে হাজার হাজার ভারী পণ্যবাহি ট্রাক, মাঝারি পণ্যবাহি গাড়ি, শত শত অয়েল ট্যাংকার, দূরপাল্লার বাস লোকাল বাস, লরি, ট্যাক্সি, প্রাইভেট কার, এম্বুলেন্স, টোটো, হাজার হাজার মোটর সাইকেল, বাই সাইকেল ইত্যাদি ইত্যাদি।সাধারণ মানুষ বলছেন সবকিছু মিলেমিশে যানজট বিড়ম্বনা এক প্রকান্ড আকার ধারণ করেছে এই আন্দুল রোডে। বাধ্যতামূলকভাবে প্রতিদিন স্কুল পড়ুয়ারা অত্যান্ত বিপদজনক অবস্থায় রাস্তা পেরিয়ে বিদ্যালয়ে আসা যাওয়া করছে। একজন স্থানীয় বাসিন্দা বলছেন, যানজট এতো যে এখানে যিনি এসেছেন তিনি উপলব্ধি করেছেন হাড়ে হাড়ে। প্রবীণ মানুষদের তো রাস্তা পারাপার করা কার্যত অসম্ভব।আপদকালীন রোগী নিয়ে ছুটে চলা এম্বুলেন্স ও আটকে পড়ে ঘন্টার পর ঘন্টা। এগোবার ও উপায় নেই, পেছানোর ও উপায় নেই।উপরিউল্লেখিত বিস্তীর্ণ এলাকার বিপুল জনরাশির নিজ নিজ গন্তব্যস্থলে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে শুধুমাত্র বিলম্ব বিড়ম্বনা নয়, পরিস্থিতি ভয়াবহ রুদ্ধশ্বাস পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে।দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান ও বাড়ছে লাফিয়ে লাফিয়ে। পুলিশ প্রশাসন ও করপোরেশন এর প্রশংসনীয় ভূমিকা থাকলেও মানুষ মনে করেন এই বিড়ম্বনার অবসানে তা ব্যার্থ। কিন্তু কেনো এই সমস্যা ? একজন টিডিএন বাংলাকে বলছিলেন “যানবাহন নিয়ন্ত্রণে ট্রাফিক পুলিশের উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ও পর্যবেক্ষণ থাকা সত্তেও কার্যতঃ অজস্র গাড়ির সংখ্যা ও রাস্তার সংকীর্ণতার কারণে যানজট সমস্যা নিবারণ করা মূলতঃ অসম্ভব।” বিপুল জনরাশির মধ্যে ক্ষোভের পারদ বাড়ছে। অসহ্য এই যানজটে আঁটকে থাকা বিস্তীর্ণ এলাকার মানুষের প্রতিদিনের এই প্রীতিক্ষা করার বিড়ম্বনা, যন্ত্রণা সহ্যের শেষ কোথায়? বিস্তীর্ণ এলাকার স্থানীয় বাসিন্দারা, নিত্যদিন এ পথে যাতায়াতকারী সাধারণ পথচারীরা ক্ষোভে ফুঁসছে। এ পথে সেফলি গাড়ি চালানো দূরের কথা, প্রয়োজনে সামান্য রাস্তা পারাপারে হাওড়ার আন্দুল রোড পরিণত হয়েছে এক কঠিন দুর্গমতায়। এ পথে সেভ লাইফ, সেফ ড্রাইভ নীতি মেনে গাড়ি চালানো কতটা সম্ভব ? প্রশ্ন তুলেছেন সাধারণ মানুষ। হাই গুডস ট্রান্সপোর্ট থেকে আরম্ভ করে যাবতীয় প্রকার পণ্যবাহী গাড়ি, ট্যাংকার, ছোট গাড়ি, টোটো ইত্যাদি সমস্ত ধরণের গাড়ি চলাচলের ঢালাও ছাড়পত্র, এই সংকীর্ণ রাস্তাকে করে তুলেছে বিপদজনক দুর্গম সড়ক।

দিনব্যাপী কর্মব্যস্ত নগরজীবন এই দুর্যেও দুর্গম সড়কের ভোগান্তিকে রোজকার সমস্যা মেনেই ছুটে চলেছে। আর রাত্রিকালীন অবস্থা আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করে, পুরোপুরি দখল নিয়ে নেয় হেভি গুডস ক্যারীয়েজ আর যাবতীয় ধরণের লরি। প্রশ্ন উঠছে এ হেন ব্যাস্তময় গুরুত্বপূর্ণ রাস্তার চিত্র কবে বদলাবে? আন্দুল রোড সংলগ্ন বিস্তীর্ণ এলাকার সাধারণ মানুষদের থেকে দাবি উঠছে অজস্র গাড়ির সংখ্যায় রাশ টানার পক্ষে, দাবি উঠছে ফ্লাই ওভার প্রসারণ দ্বারা দ্বিতীয় হুগলী ব্রীজ থেকে NH 6 এর সাথে যুক্ত করার জন্য, দাবী উঠছে সড়ক প্রসারণ নিয়ে, দাবী উঠছে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করার বিষয় নিয়ে। নগর উন্নয়ন দপ্তর, করপোরেশন, পুলিশ প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সম্মিলিত তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ, আলোকপাত ও প্রয়োজনীয় ব্যাবস্থাদি ও পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ দ্বারা যদি কোনোদিন এই যানজট বিড়ম্বনার অবসান ঘটে, সেই আশায় হাওড়ার আপামর সাধারণ মানুষ।