টিডিএন বাংলা ডেস্ক: দশম শ্রেণীর ছাত্র সিবগাতুল্লাহর মায়ের চোখের জল আর বাবা ঈমদাদুল্লাহ রশিদির শান্তির বার্তা নিয়ে আলোচনার মধ্যেই বছর পেরিয়ে গেল। কিন্তু এতদিন পরেও আসানসোলের নূর মসজিদের ইমামের মুখে ‘সেই শান্তির বার্তা’। ঈমদাদুল্লাহ রশিদি টিডিএন বাংলাকে জানান,’আমার আর কী করার আছে। ইসলাম শান্তি ও মানবতার কথা বলে। আমি সেই শান্তির বার্তা-ই দিয়ে যাবো। আমি কোনও মামলা বা এফআইআর করিনি। এদেশের প্রশাসন, সরকার ও মানুষের কাছে সবকিছু ছেড়ে দিয়েছি। পুলিশ কেস হয়েছে। দুইজনকে গ্রেফতার করেছিল। এখন ওই দুইজন জামিনে মুক্ত।’

বাংলার শান্তির দূত বলে পরিচিত ইমাম বলছেন, হিংসা ছড়ানো মানুষের কাজ নয়। মানুষ দুনিয়ায় যে কয়দিন বাঁচবে মিলেমিশে বাঁচবে। আমি জানি দুনিয়ায় সব বিচার মেলেনা। আমার ছেলের যতদিন হায়াত ছিল বেঁচেছে। আল্লাহ চাইলে কিয়ামতের দিন বিচার হবে। ততদিন ক্ষমা, ধর্য্য আর শান্তির বাণী সবার কাছে পৌঁছে দিতে হবে।”

গত বছর ১৬ বছরের ছেলের ক্ষতবিক্ষত শরীর চিহ্নিত করেও এই বাংলার ঐতিহ্যকে বুক আগলে রক্ষা করেছেন। সেদিন তাঁর চোখের জলের সঙ্গে খানিকটা উষ্মাই হয়তো দাবানলের মত ছড়িয়ে দিতে পারতো আগুন। কিন্তু তা হয়নি। সব যন্ত্রনা বুকে চেপে শান্তির প্রচার করে দুনিয়াকে অবাক করে দিয়েছিলেন তিনি। মৃত্যুর পর ছেলের মাধ্যমিক পরীক্ষার ফল দেখে বলেছিলেন,’এই হচ্ছে দুনিয়া।’

এখন এক বছর আগের সেই ভয়ের ছবি নেই। সবকিছু স্বাভাবিক। আসানসোল রেলপাড় সংলগ্ন এনআরআর রোডে সেই নূরানি মসজিদের আশপাশে স্বাভাবিক ব্যস্ততা। মসজিদের দোতলায় একটি ছোট ঘরে এখনও ইমাম মৌলানা ইমদাদুল রশিদি বসে থাকেন। আল্লাহর উপাসনা, সমাজ গঠনের কাজের মাঝেও সিবগাতুল্লাহর কথা ভুলতে পারেন না। তার জন্য দুয়া করেন।

ইমাম জানালেন, ‘এই ভারত আমাদের জন্মভূমি। আমাদের পূর্বপুরুষের রক্ত মিশে আছে আজাদির লড়াইয়ে। তবে এত বড় ঐতিহ্যের সেই দেশে ধর্ম, খাদ্য, পোশাক এখন রাজনীতির ইস্যু, এটা কষ্ট দেয়। যাদের দেশের আজাদির লড়াইয়ে কোন ভূমিকা নেই তাঁরা এখন আমাদের দেশদ্রোহী বলে! আসলে আমরা ‘ভয়’ পাই। সেদিন রাতে ভয় পাইনি বলেই আসানসোলে দাঙ্গা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারেনি। ধর্মের নামে রাজনীতির বিরুদ্ধে
সম্মিলিত প্রতিবাদ হোক।

এক বছর আগে এই টিডিএন বাংলা যেখানে সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সেই মসজিদের ছোট্ট ঘরে বসেই ইমাম রশিদী বলেন,’আমার ছেলের খুনিদের শাস্তি নিয়ে আমি বিচলিত নই। গঙ্গা-যমুনা বয়ে গেছে এই দেশে। এখানে আজাদির দীর্ঘ লড়াইয়ের ইতিহাস আছে। সব ধর্ম, বর্ণের মানুষ এই দেশে বাস করে। এখানে সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলা হয়। আমি সেদিন আসানসোলে শান্তিপ্রিয় সব মানুষের কাছে যা বলেছিলাম সেটাই আমার বার্তা । আমার পুত্রের মৃতদেহের বদলে আরো অনেক মৃতদেহ, আগুন দেখতে পেলে কী আমার পুত্রশোক কমতো? না, কমতো না বরং বাড়তো। আমার পুত্রকে আমি যে চোখে দেখি অন্যের পুত্রকেও যদি সেই চোখে দেখতে পারি তাহলে আর বিভেদ কোথায়? চোখ, দৃষ্টিভঙ্গির ওপর নির্ভর করে। চাইলেও ধর্ম ব্যবসায়ীরা বিভাজন করতে পারবে না। তুমি ভুল করেছো, তাই আমিও পালটা ভুল করে প্রতিশোধ নেবো- এটা হতে পারে না। বিশ্বের কোনো ধর্ম অশান্তি, খুন, রক্ত চায় না।”

ছেলের খুনের এক বছর পরও গোটা দুনিয়া থেকে যেভাবে তাঁকে কুর্ণিশ জানানো হচ্ছে তা নিয়ে চিন্তিত নন তিনি। ইমাম বললেন,’এইসব করে কী হবে? মানুষের বিবেক বোধ আর জবাবদিহির চেতনা না থাকলে কোনও কিছুতে কিছু হবেনা।’

একটি রাজনৈতিক দলের দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন তোলেন ইমাম। তিনি বলেন,’দেশের স্বাধীনতার লড়াই আমাদের পূর্বপূরুষরা লড়েছিলেন। এই ভারতের আজাদির লড়াইয়ে আমাদের রক্ত আছে। এই ভারতের আজাদির লড়াইয়ে আমাদের আত্মত্যাগ আছে। এখন শুনছি কেউ কেউ পাকিস্তানে যেতে পরামর্শ দেয়। এরা কোনদিনও আজাদির লড়াই লড়েছে? আজাদির লড়াইয়ের কোনও ইতিহাস আছে এদের? নেই। নেই বলেই এই দেশ ভাঙতে, দেশের মানুষকে ভাগ করতে এতটুকুও কষ্ট হয় না তাঁদের। আমাদের দেশপ্রেম নিয়ে যারা প্রশ্ন তোলে তাঁরা মূর্খ।তবে বিভেদ করে লাভ নেই,পৃথিবীর মানুষ শান্তির পক্ষে।’

নিজের ছেলে চলে গেছে। ইমাম বলছেন, দোষীরা জামিনে মুক্ত। ন্যায় বিচার আদৌ মিলবে কিনা জানা নেই। তবে ইমাম বলছেন,’পৃথিবী শান্তিময় হোক। পৃথিবীর সব দ্বন্দ্ব মিটে যাক। একদিন আল্লাহর কাছে সবাইকে জবাব দিতে হবে। পাপ পুণ্যের সেই বিষয়টি ভেবে সবাই চললে কোনও অন্যায় থাকতো না।’