সেখ শানাওয়াজ আলি, টিডিএন বাংলা, করিমপুর : দেশজুড়ে বাড়তে থাকা অসহিষ্ণুতার প্রতিবাদে ‘চাই সহিষ্ণুতা, চাই মানবীয় সংহতি’ শীর্ষক সম্মেলনের আয়োজন করল জামায়াতে ইসলামি হিন্দ নদীয়া জেলা শাখা। শনিবার এই সভায় দেশব্যাপী মানবীয় সংহতি প্রতিষ্টার দাবি তুলে বিভিন্ন বক্তব্য রাখেন সংগঠনটির নেতৃত্ব ও বিশিষ্টজনেরা।

উক্ত সভায় সংগঠনটির জেলা সভাপতি আসগার আলী মন্ডল বলেন, “মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্ক হতে হবে ভালোবাসা ও ভাতৃত্বের। জেলা, রাজ্য, দেশ তথা দুনিয়া জুড়ে যে অসহিষ্ণুতার পরিবেশ তৈরি হয়েছে জামায়াতে ইসলামী হিন্দ নদীয়া জেলা তার অবলুপ্তি চাই। বিশ্ব ভাতৃত্ববোধ মানুষের চিন্তাকে প্রসারিত করে, ভারতে দিন দিন হিংসার পরিবেশকে বাড়ানো হচ্ছে, সাম্প্রদায়িক শক্তিগুলি নির্দিষ্ট লক্ষ্যে এধরনের জঘন্য কাজ করে চলেছে।”

তিনি আরো বলেন, “বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্যই ভারতের মতো দেশের মহান ঐতিহ্য। কিন্তু কোনো অশুভ শক্তি এই ঐক্য বিনষ্ট করতে সদা তৎপর রয়েছে। পেহলু খান, আখলাক ও জুনাইদ হত্যা তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ।” গাভালকার এবং গৌরী লংকেশের হত্যা অসহিষ্ণুতার নিকৃষ্ট দৃষ্টান্ত। ভোটের রাজনীতি সাম্প্রদায়িক বিভাজন ও মানবীয় সম্প্রীতিকে বিপন্ন করে তুলেছে । জনগনের মধ্যে ভাতৃত্ববোধ গড়ে তুলতে, মানবীয় সম্প্রীতির চেতনাকে প্রসারিত করতে জামায়াতে ইসলামী হিন্দ নদীয়া জেলা এই সম্মেলনের আয়োজন করেছে। বিভিন্ন বর্ন, ধর্ম ও গোষ্ঠীর মধ্যে সহিষ্ণুতার ভাবধারাকে উজ্জীবিত করতে এই সম্মেলন জোরদার প্রচেষ্টা চালাবে বলে দাবি সংগঠনটির। জাতীয় ঐক্যের সুদৃঢ়করন, ভ্রাতৃত্বের মজবুতিকরণ ও হিংসামুক্ত দেশ গঠনের লক্ষ্যেই এই জেলা সম্মেলনের মূল উদ্দেশ্য।

এদিন সংগঠনটির রাজ্য সভাপতি মুহাম্মদ নুরুদ্দিন বলেন, “রাজ্য ও দেশজুড়ে চলমান অসহিষ্ণুতার পরিস্থিতি, দুর্নীতি, অশিক্ষা এবং ধর্ষণ সহ নানাবিধ সমস্যার সমাধান চাই আমরা। সহিষ্ণুতার অভাব চারিদিকে। যেমন জাত-পাতের অসহিষ্ণুতা। এমনকি রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতাও বর্তমানে প্রকট আকার ধারণ করেছে। সমাজের পাশাপাশি রাষ্ট্রও অসহিষ্ণুতার পরিচয় দিচ্ছে। হিন্দু জাতীয়তাবাদ ভারতবর্ষের মতো ধর্মনিরপেক্ষ দেশের জন্য কাম্য নয়, কেন্দ্রের বিজেপি সরকার এইরূপ অসহিষ্ণুতার প্রমাণ দেওয়ার জন্য, আজ তাদের পরাজয় ঘটছে দিকে দিকে। স্বাধীনতার মর্যাদাকে সমুন্নত করতে হলে আমাদের অবশ্যই জাতীয় উন্নয়ের জন্য মানবিক ঐক্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে। নদীয়া জেলায় বহু মহাপুরুষের আবির্ভাব হয়েছে। এখান থেকেই সম্প্রীতির বাতাবরণ ছড়িয়ে দিতে হবে।”

মুসলিম পার্সোনাল ল’ বোর্ডের সদস্য ডাঃ রইসউদ্দিন বলেন, “সহিষ্ণুতার বার্তা দেওয়া খুব সময় উপযোগী সিদ্ধান্ত।আজকের প্রয়োজন সাম্প্রদায়িকতার উৎস ও তা থেকে উত্তরণের পথ অনুসন্ধান করা। মনুষ্য জাতির ইতিহাসের শুরু থেকে আজ পর্যন্ত পৃথিবীর মানুষদেরকে মানবীয় সংহতি ও মানবীয় ভাতৃত্বের পথ দেখানোর জন্য মানুষের সৃষ্টিকর্তা যুগে যুগে লক্ষাধিক মহাপুরুষকে পাঠিয়েছেন ও তাঁদেরকে তাঁর উপদেশ হুকুম ও নিষেধের মাধ্যমে সহযোগিতা করেছেন, যাতে করে তাঁরা সারা দুনিয়ার মানুষের মধ্যে প্রেম প্রীতি ভালোবাসা সৃষ্টি করতে পারেন ও তাদের কে শান্তিপূর্ন সহাবস্থানের ব্যবস্থা করতে পারেন। মানুষের উচিৎ স্রষ্টার পাঠানো নীতি ও সেই সমস্ত মহাপুরুষদের নেতৃত্বের অনুসরণ করা।”

এদিন সংগঠনটির রাজ্য সম্পাদক আব্দুর রফিক বলেন, “দেশব্যাপী ঐক্য প্রতিষ্ঠা করা মুসলিমদের ঈমানী দায়িত্ব। এই দায়িত্ব এদেশের কোনো জনগোষ্ঠী না নিলেও, মুসলমানদের অবশ্যই নিতে হবে। তাই মানবীয় সংহতি বর্তমানে খুবই জরুরি হয়ে পড়েছে।”

সাংবাদিক মোকতার হোসেন মন্ডল দীপ্ত কন্ঠে বলেন, “এই পৃথিবী আমার, আমি যেখানে খুশি থাকতে পারি।” পশ্চিমবঙ্গের জেলে বন্দি থাকা নিরীহ রোহিঙ্গাদের মুক্তির দাবি করেন তিনি। দেশের বেড়ে চলা দাঙ্গা ও হানাহানি নিয়ে তিনি বলেন ‘এ আমার ভারতবর্ষ নয়’, সারা দুনিয়ায় যেখানেই নির্বিচারে মানুষ মরছে সবাই আমার ভাই।’ এছাড়াও তিনি ৭০ লাখ জনবসতির জেলা মুর্শিদাবাদে একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় না হওয়াকে তিনি সরকারি বঞ্চনা বলে উল্লেখ করেন।

সংগঠনের রাজ্য মহিলা শাখার দায়িত্বশীল নাইমা আনসারী বলেন, “এদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে মুসলিম নারী-পুরুষ উভয়েই বৃহত্তর ভূমিকা রেখেছে কিন্তু আজ এক অসহিষ্ণু রাজনৈতিক শক্তি সেই ইতিহাস বিকৃতির করতে উঠে পড়ে লেগেছে।” তিনি আরো বলেন, “আজ সরকারিভাবে মুসলিমদের সন্ত্রাসী প্রমাণ করার অপপ্রয়াস চলছে। কিন্তু পৃথিবীর ইতিহাসে বৃহত্তর মানবহত্যার নজির মুসলিমদের দ্বারা সংগঠিত হয়নি।”

এছাড়াও উক্ত সভায় উপস্থিত ছিলেন সংগঠনটির প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি রহমত আলি খান, সংগঠনটির প্রাক্তন নদীয়া জেলা সভাপতি ডাঃ সিরাজুল ইসলাম প্রমুখগণ।