টিডিএন বাংলা ডেস্ক: মঙ্গলবার মন্ত্রিত্ব থেকে পদত্যাগ করলেন শোভন চ্যাটার্জি। তিনি আবাসন এবং দমকল দপ্তরের মন্ত্রী ছিলেন। তাঁর পদত্যাগপত্র গৃহীত হয়েছে বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। জানা গেছে, শোভন চ্যাটার্জিকে কলকাতার মেয়র পদ থেকেও সরে দাঁড়ানোর নির্দেশ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।

মোদ্দা কথা — তিনি গেলেন। কিন্তু এই ঘটনার মাধ্যমে ঐতিহাসিক কলকাতার মেয়র কিংবা রাজ্যের মন্ত্রিত্ব পদ — নজিরবিহীন কাদা, লজ্জা মাখিয়ে দিয়ে গেল তৃণমূল কংগ্রেস।

বরাবর মমতা ব্যানার্জির প্রতি বিশ্বস্ত শোভন চ্যাটার্জি। তৃণমূল কংগ্রেসের প্রাক্তন সাংসদ কবীর সুমনের বিবরণ থেকেই জানা যায় যে, গাড়িতে সফরসঙ্গীদের বিস্কুট বিতরণের মতো দায়িত্ব শোভন চ্যাটার্জিকেই দিতেন মমতা ব্যানার্জি। এতটাই বিশ্বস্ত, কাছের ছিলেন ‘কানন’। সেই তাঁর পদত্যাগের কারণ কী? অধ্যাপিকা বৈশাখী ব্যানার্জির সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্কের কারণে শোভন চ্যাটার্জি তাঁর দায়িত্বে অবহেলা করছেন বলে মুখ্যমন্ত্রী রুষ্ট — পদত্যাগের পরে এটিই সবচেয়ে প্রচারিত ‘কারণ’। গত বেশ কয়েক মাস এই নিয়ে শোভন চ্যাটার্জি সম্পর্কে নানা খবরও প্রকাশ করা হয়েছে তৃণমূল কংগ্রেসের একটি অংশ থেকে। কিন্তু দলনেত্রী হিসাবে যাঁরা মমতা ব্যানার্জিকে দীর্ঘদিন চেনেন তাঁদের কয়েকজনের বক্তব্য, শোভন চ্যাটার্জিকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। তার জন্য ‘বৈশাখী ফ্যাক্টর’-র থেকেও গুরুত্বপূর্ণ কারণ আছে। তাই কায়দা করে আপাতত তাঁর প্রিয় ‘কানন’-কে ছেঁটে ফেলতে চেয়েছেন মমতা ব্যানার্জি।

একাধিক দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে শোভন চ্যাটার্জির বিরুদ্ধে। নারদ স্টিং অপারেশনে তিনি অন্যতম অভিযুক্ত। ক্যামেরায় তাঁকে তোয়ালে মুড়ে টাকা নিতে দেখা গিয়েছিল। বিনা প্যানকার্ডে প্রায় ৩৪৫ কোটি টাকা লেনদেনের একটি অভিযোগ রয়েছে শোভন চ্যাটার্জির বিরুদ্ধে। আয়কর দপ্তরের নজর আছে তাঁর উপর। ওই তদন্তের গতিপ্রকৃতি বুঝে তৃণমূল কংগ্রেসনেত্রী শোভন চ্যাটার্জিকে গুরুত্বপূর্ণ পদগুলি থেকে সরাতে উঠেপড়ে লেগেছিলেন। তৃণমূল কংগ্রেসের এক নেতা তথা রাজ্যের এক মন্ত্রীর বক্তব্য,‘‘মুকুলের মতো শোভনও বি জে পি-র দিকে যেতে পারে বলে আশঙ্কা আছে।’’ এই বিষয়ে বি জে পি-র রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা হলে, তাঁর পক্ষ থেকে জানানো হয় — তিনি এদিন কিছু বলবেন না।

কী হয়েছিল মঙ্গলবার? বিধানসভায় সি পি আই(এম) বিধায়ক খগেন মুর্মু ‘গীতাঞ্জলী’ প্রকল্পের অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন করেছিলেন। আবাসন মন্ত্রী হিসাবে শোভন চ্যাটার্জি জবাব দেন যে, রাজ্যে ৩লক্ষ ৮৩ হাজার বাড়ি তৈরি হয়েছে ওই প্রকল্পে। এছাড়া গ্রামোন্নয়ন, নগরোন্নয়নসহ বিভিন্ন দপ্তরের গৃহ নির্মাণের প্রকল্পে ২৫লক্ষ বাড়ি হয়েছে। শোভন চ্যাটার্জির এই জবাবের পরেই উঠে দাঁড়ান মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর বলার কথাই নয়। কিন্তু সব দপ্তরের বিষয়েই তিনি আগ বাড়িয়ে চূড়ান্ত কথা বলার চেষ্টা করেন — এটি বিধানসভার একটি পরিচিত দৃশ্য হয়ে উঠেছে। এদিন মমতা ব্যানার্জি বলে ওঠেন যে, ওটা ২৫ লক্ষ হবে না। ৪০ লক্ষ স্যাঙ্কশ্যান্ড।

এরপর অধ্যক্ষের ঘরে শোভন চ্যাটার্জিকে ডেকে পাঠান মুখ্যমন্ত্রী। সেখানে অনেকের সামনে তিনি শোভন চ্যাটার্জিকে বলেন, ঠিক মতো কাজ করছিস না। কাজ ফেলে শাড়ি-চুড়ির দোকানে ঘুরে বেড়াচ্ছিস। এতে শোভন চ্যাটার্জি রেগে যান। তিনি প্রতিবাদ করেন। এতে মুখ্যমন্ত্রী চটে যান। এরপর আর এক প্রস্থ গোলমাল হয় নবান্নে। শোভন চ্যাটার্জিরই দমকলের দপ্তরের অনুষ্ঠান ছিল। কতগুলি দমকলের গাড়ি উদ্বোধন করেন মুখ্যমন্ত্রী। সেখানেও তাঁকে দেখা যায় শোভন চ্যাটার্জিকে উদ্দেশ্য করে কিছু বলতে। পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলেন দলে শোভন চ্যাটার্জির ঘোর বিরোধী নগরোন্নয়ন মন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম। ছিলেন মুখ্যসচিব মলয় দে। এরপর নবান্নে নিজের ঘরে চলে যান শোভন চ্যাটার্জি। কিছুক্ষণ পরে মুখ্যমন্ত্রীর বিশেষ সচিব গৌতম সান্যালের হাতে পদত্যাগপত্র দিয়ে বেরিয়ে যান। কিন্তু তখনও মেয়র পদ থেকে পদত্যাগ করেননি শোভন চ্যাটার্জি। জানা গেছে, মুখ্যমন্ত্রী তাঁকে মেয়র পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর নির্দেশ দিয়েছেন।

গত অক্টোবরে একটি মন্ত্রীসভার বৈঠকের পরে পদত্যাগ করতে চেয়েছিলেন শোভন চ্যাটার্জি। ৯ই অক্টোবরের সেই বৈঠকে সবার সামনেই বৈশাখী ব্যানার্জির সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে কিছু কথা বলেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। দলের একটি কর্মসূচিতে না থেকে মেয়র শাড়ির দোকানে ছিলেন বলে মুখ্যমন্ত্রী ইঙ্গিত করেন। এমনকি শোভন চ্যাটার্জি যে শাড়ির দোকানে ছিলেন, তার ছবিও আছে বলে জানিয়েছিলেন মমতা ব্যানার্জি। সেদিন তাঁর পিছনে লোক লাগিয়ে রাখা হয়েছে বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন শোভন চ্যাটার্জি। পদত্যাগের ইচ্ছাও প্রকাশ করেন। সম্প্রতি দলের দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় শোভনকে। গত জুনে তাঁর হাত থেকে পরিবেশদপ্তর নিয়ে দেওয়া হয় শুভেন্দু অধিকারীকে।

মঙ্গলবার আগের কোনও ঘটনার উল্লেখ না করে মুখ্যমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন,‘‘আগে বুঝিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম হয়ত বুঝবে। আজকে আবার দিয়েছে। অ্যাকসেপটেড।’’ তিনি জানিয়ে দেন যে, শোভনের দপ্তরদুটি সামলাবে ববি (ফিরহাদ হাকিম)। জানা গেছে, কর্পোরেশনের কাজ সামলাতে বলা হয়েছে কমিশনার খলিল আহ্‌মেদকে। কে হবেন পরবর্তী মেয়র? এদিন সন্ধ্যা থেকে তা নিয়েও শাসকদলে উত্তাপ বাড়ছে — অতীন ঘোষ, দেবাশিস কুমারের নাম উঠে এসেছে।

পদত্যাগের পরে ঘনিষ্ঠ মহলে শোভন চ্যাটার্জি বলেছেন যে, এমনভাবে অপমানিত হয়ে আর থাকা যাচ্ছিল না। মন্ত্রিত্ব এবং মেয়র পদ ছাড়ার পর বি জে পি-র দিকে ‘ঝুঁকে পড়া’র সুযোগও অনেকটা বেড়ে গেল শোভন চ্যাটার্জির কাছে। প্রসঙ্গত, বি জে পি-তে যোগ দেওয়ার আগে মুকুল রায়ের সঙ্গে মমতা ব্যানার্জির সম্পর্কেরও অবনতি হয়েছিল বলে জোরদার প্রচার হয়েছিল। মুকুল রায়কেও প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল।