টিডিএন বাংলা ডেস্ক : বসিরহাট মহকুমার বাদুড়িয়ার প্রত্যন্ত গ্রাম বাজিতপুর। ১৯৮৭ সালের এই প্রত্যন্ত গ্রামে জন্ম নেন আজিজুল মোল্লা। বাবা আশরাফ আলীর স্বপ্ন ছিল, ছেলে বড় হয়ে যেন সেনাবাহিনীতে যোগ দেয়। বাবার ইচ্ছের মূল্য দিতে নিজেকে তৈরি করে ছেলে আজিজুল। ২০০৪ সালে একই সঙ্গে পুলিশ এবং সেনাবাহিনীর চাকরিতে যোগ দেওয়ার সুযোগ আছে। তার মধ্যে সেনাবাহিনীর চাকরিকেই বেছে নেয় আজিজুল। অসুস্থ মা আফুরা বিবি এবং প্রতিবন্ধী বোন আঞ্জুরাকে ছেড়ে সেনাবাহিনীর কাজে যোগ দিতে পাড়ি কাশ্মীর সীমান্তে। বাবার ইচ্ছাকে সম্মান জানিয়ে চাকরি জীবনে পেরিয়ে যায় বেশ কয়েক বছর।

হঠাৎ ঘটে ছন্দপতন। ২০১৬ সালের ১৬ ই আগস্ট রাত ১২ টায় দুঃসংবাদ আসে আজিজুলের বাড়িতে। কাশ্মীরের বারামুলা সীমান্তে পাহারা দেওয়ার সময়ে জঙ্গিদের গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে গিয়েছে আজিজুল। বাড়ির সামনে খাটিয়াতে বসে ছেলের ছবি বুকে জড়িয়ে ধরে কথাগুলো বলতে বলতে চোখের জল বাধ মানে না আশরাফ আলীর। তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন সংবাদ ভারতীয় জওয়ানদের খুন করা কথা শুনে আমি আর স্থির থাকতে পারছি না। মনে হচ্ছে এই বয়সেও আমি পারবো ছেলের মত জঙ্গিদের মোকাবেলা করতে।’

তবে আশরাফ আলী মনে করেন হিংসা দিয়ে কখনো হিংসাকে জয় করা যায় না। এর জন্য রাজনৈতিক এবং ধর্মীয় ভেদাভেদ ভুলে দেশের মানুষকে এক হয়ে প্রতিবাদে সোচ্চার হতে হবে। তবেই বিদেশী শত্রু এই ভূমিতে পা রাখতে পারবে না। দু চোখ দিয়ে অবিরাম জল গড়ায় বাবার। একমাত্র ছেলে আজিজুলের মৃত্যুতে যন্ত্রণা রয়েছে তবু এতটুকুও ভেঙে পড়েননি আশরাফ আলী। বরং দেশ রক্ষার শহীদ হওয়া ছেলের জন্য আজও গর্ববোধ করেন তিনি।

বুকে পাথর চাপা দিয়ে কাতর স্বরে বলেন, বাড়িতে পড়ে রয়েছে অসুস্থ স্ত্রী ও মেয়ে। তাদের নিয়ে বড়ই খারাপ সময়ের মধ্যে দিয়ে চলতে হচ্ছে। আজিজুল এর স্ত্রী তুহিনা জাফরপুর গ্রামে তার বাপের বাড়িতে থাকেন। নাতি ইনজামাম মোল্লা এবং নাতনি মিষ্টি জিন্নাত মায়ের কাছে থেকে পড়াশোনা করে। স্ত্রী ও প্রতিবন্ধী মেয়েকে নিয়ে এখন একটাই সম্বল প্রিয় গরু ‘ময়না’। ময়না কে জড়িয়ে ধরে তিনি বলেন, এই অবস্থায় দুধ বিক্রি আর লিজে দেওয়া ৫ বিঘা জমির টাকা নিয়ে কোনমতে সংসার চলছে।

তিনি আরও বলেন, ছেলের মৃত্যুর পর কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে বৌমাকে সামান্য অর্থ দেওয়া হয়েছিল। রাজ্য সরকারের পক্ষে ছেলের নামে গ্রামের রাস্তা এবং শহীদ বেদী ছাড়া বিশেষ কিছু সাহায্য মেলেনি। অন্যদিকে ছেলের কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়লেন মা আফুরা বিবি। কোনরকমে নিজেকে সামলে তিনি বলেন, ‘জঙ্গিদের পেলে একবার তাদের জিজ্ঞেস করতাম কেন তারা মায়ের কোল খালি করে দেয়? আমার আর এক ছেলে থাকলে দেশ রক্ষায় তাকেও সেনাবাহিনীতে পাঠিয়ে দিতাম।’