টিডিএন বাংলা ডেস্ক: উনিই রায়গঞ্জের জনতার মুখ। উনিই রায়গঞ্জের মানুষের সুখ দুঃখ।

প্রতিবন্ধী ভাতা পাচ্ছেন না? পাশে মহম্মদ সেলিম। রায়গঞ্জ হাসপাতালের ডাক্তারবাবুরা রোগীকে বলেছেন কলকাতায় এসএসকেএম হাসপাতালে নিয়ে যেতে, কাকে বলবেন? সমাধান মহম্মদ সেলিম। বন্যায় ভেঙে গিয়েছে রাস্তা, কালভার্ট। কে ঠিক করবেন? সমাধান মহম্মদ সেলিম। রায়গঞ্জ লোকসভা কেন্দ্রের একের পর এক ব্লক, গ্রাম পঞ্চায়েত, বুথে মহম্মদ সেলিমই যেন পঞ্চায়েত সদস্য, তিনিই পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি, তিনিই জেলা পরিষদের সদস্য আর সর্বশেষে তিনি সাংসদ! গ্রামের পর গ্রামে তৃণমূল জনজীবন থেকে উধাও, পঞ্চায়েত ব্যস্ত স্বজনপোষণ আর তোলবাজিতে, তাঁকে পেয়েই মানুষ জানান সব সমস্যাকে। গ্রামের আলপথ ধরে, নিকোনো উঠোনে, গ্রামের গাছতলায় সর্বত্র তিনিই যেন ‘মুশকিল আসান’। ‘আসলে এঁরা কাউকে মনের কথা বলতে পারেন না, এমএলএ, মন্ত্রী এঁদের কাছে ভয়ের ব্যাপার। তাই আমাকে সামনে পেলেই পঞ্চায়েতের অভিযোগ থেকে হাসপাতালে ভর্তি সব আমাকেই বলেন’, হাসতে হাসতে বলেছেন মহম্মদ সেলিম।

রায়গঞ্জ ব্লকের ভাটোল গ্রাম পঞ্চায়েতের খাড়ি গোবিন্দপুর গ্রাম। গ্রামের কোল ঘেঁষে বয়ে গিয়েছে নাগর নদী। ২০১৭ সালের আগস্ট মাসের বন্যায় নাগর নদীই হয়ে উঠেছিল সর্বংসহা। পঞ্চায়েত আসেনি। পঞ্চায়েত সমিতি স্পিড বোট নিয়ে মাছ ধরে বেড়িয়েছে, জেলা প্রশাসনের সময় হয়নি বন্যায় ডুবো গ্রামে পৌঁছানোর। নাগর নদীর জলে ভেলায় চেপে ঘুরে বেড়িয়েছেন মহম্মদ সেলিম। রাস্তা ভেঙেছে বন্যায়। পুনর্গঠনেও সাংসদ তহবিল থেকে হয়েছে রাস্তা। সোমবার সকালে খাড়ি গোপালপুরপুরে পৌঁছেছেন জনগণের প্রিয় সাংসদ, ঘিরে ধরে একের পর এক আব্দার। এই গ্রামেই দেখা হয়েছে আসরফ হোসেন আর মহম্মদ জাহিরের সঙ্গে, দুজনেই থাকেন ‘বিদেশে’। উত্তর দিনাজপুরের একের পর এক ব্লকে ‘বিদেশ’ মানে হয় কেরালা বা দিল্লি বা হয়তো চেন্নাই। মাঠের জনমজুরিতে আয় নেই তাই ভিন রাজ্যে পরিযায়ী, ওঁরা ফিরেছেন দু’সপ্তাহ আগে। সামনের ভোটে কি হবে? কি ভাবছেন? ‘আমরা তৃণমূল করি কিন্তু সেলিম কাকুকে ভোট দেব। যখন বন্যায় আমাদের ঘর বাড়ি মাদ্রাসা ছিল জলের তলায়, উনিই শুধু এসেছেন আমাদের কাছে। এমপি’কেও যে ফোন করা যায় আর এমপি নিজেই ফোন ধরেন, সেলিম কাকুকে না দেখলে আমরা জানতামই না’, বলেছেন আসরফ আর জাহির। ভাটোলের গা ঘেঁষা গ্রাম খাড়ি গোবিন্দপুরে থাকেন এজাবুল হক। অদ্ভুত কারণে তিনিও ‘সেলিম কাকুকে’ ভোট দেবেন। ‘আমরা তো ভয়ে বলতে পারি না, উনি চিৎকার করে পার্লামেন্টে তৃণমূলের চোরকে চোর বলেন। আমাদের রায়গঞ্জের এমপি মুখ খুললে ধমকে দেন নরেন্দ্র মোদী, রাজনাথ সিংকেও, উনি আমাদের গর্ব’, বলেছেন এজাবুল। ভাটোল গ্রাম পঞ্চায়েত পেরিয়ে জগদীশপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের রুনিয়া গ্রাম, সেলিম আসবেন শুনে গ্রামের মানুষ ভিড় জমিয়েছেন সকাল থেকে।

পঁচাত্তর পেরনো বৃদ্ধ আকালু মহম্মদ আব্দার জানিয়েছেন গোরস্থানে নতুন আলো লাগানোর। আপনাদের গ্রামে সাংসদকে দেখতে পান? প্রশ্ন শেষ হওয়ার আগেই বলতে শুরু করেছেন বৃদ্ধ। ‘শুনুন আমি মোহিতের খাস লোক। জন্ম থেকে এখন অবধি কংগ্রেস করি, আমাদের গ্রামের সবাই সেলিম বাবুকে ভোট দেবেন কেন? আরে বাবা, রামপুর থেকে মসলন্দপুর অবধি রাস্তা, ঝুপড়ি কালি থেকে সিদ্ধি বিন্দি হাটখোলা পর্যন্ত রাস্তা, সেরপুর থেকে মহারাজা মোড় পর্যন্ত রাস্তা সব তো উনিই করেছেন’, সবাইকে থামিয়ে আঙুলের কড় গুনে গুনে বলে থেমেছেন বৃদ্ধ। জগদীশপুর পেরিয়ে সিতগ্রাম পঞ্চায়েতের কৃষ্ণমুড়ি গ্রাম। গ্রামের ভেতরে ছোট্ট পান বিড়ির দোকান চালান গৃহবধূ মোতাবা খাতুন। ‘যখন বন্যা হলো আমার দুটো গোরু ভেসে গেল বানে, একটা ত্রিপলও পঞ্চায়েত দেয়নি। অথচ আমি তৃণমূলকে ভোট দিই, আমদের গ্রামে থাকে ইফতিকার তৃণমূলের পঞ্চায়েত মেম্বার একটা জব কার্ডের কাজও দেয়নি। সেলিমবাবু বন্যায় এসেছেন গাঁয়ে, ওঁকে জানাতেই ত্রিপল মিলেছে, উনি তো পঞ্চায়েতের প্রধান’, গৃহবধু মোতাবাকে তখন বোঝানোই মুশকিল সেলিম পঞ্চায়েত প্রধান নন তিনি সাংসদ, তবু মোতাবা নাছোড়বান্দা, ইফতিকারকে বলে ত্রিপল মেলেনি, সেলিমবাবুকে বলে মিলেছে তাই উনি প্রধান! কৃষ্ণমুড়ি গ্রাম পেরিয়ে মহীগ্রামের গাছতলায় গ্রামের মানুষদের সঙ্গে কথা বলা শেষ করতেই হাসপাতালের কাগজপত্র নিয়ে মেহেন্দিগার খাতুন, ওঁর শাশুড়িকে এসএসকেএম হাসপাতালে নিয়ে যেতে বলেছে রায়গঞ্জ সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালের ডাক্তারবাবুরা। সাংসদের চিঠি পেয়েছেন মেহেন্দিগার খাতুন, সোমবারের ট্রেনেই স্বামীর সঙ্গে শ্বাশুড়ি যাবেন এসএসকেএম’এ।

রায়গঞ্জে মেডিক্যাল কলেজ খোলার অনুমোদন কেন্দ্র থেকে মহম্মদ সেলিম আদায় করেন ২০১৫-১৬ অর্থবর্ষে। ১৬৫কোটি টাকার প্রকল্পের ৬৫শতাংশ টাকা কেন্দ্র দিলেও রাজ্যের ৩৫শতাংশ টাকা নিয়ে গড়মসি রাজ্য সরকারের। ‘ইচ্ছে করে ওরা দেরি করছে মেডিক্যাল কলেজের কাজে, এবছরও ছাত্রছাত্রীরা পড়াশোনা শুরু করতে পারবে না ওদের টালবাহানায়’, অভিযোগ মহম্মদ সেলিমের। কেন গ্রামের মানুষের কাছে তিনি পঞ্চায়েত মেম্বার, তিনি প্রধান? গত পাঁচ বছরে সাংসদ তহবিলের টাকা খরচে রাজ্যের ৪২জন সাংসদদের মধ্যে এক নম্বরে সেলিম। ৫২৫টি প্রকল্পের জন্য ৩১ কোটি টাকা প্রস্তাবিত হয়েছে, এ পর্যন্ত প্রশাসন অনুমোদন করেছে ২৩কোটি টাকার প্রকল্পের। ৩০০টি প্রকল্পের কাজ শেষ, ৯০টি প্রকল্পের কাজ চলছে। ‘গ্রামে গ্রামে যখন যাই মানুষ বলতে থাকেন এই দেখুন আপনার টাকায় স্কুলের ঘর হয়েছে, আপনার টাকায় রাস্তা হয়েছে, আমি মনে করিয়ে দিই আমার নয় এটা সাংসদ তহবিলের টাকা। পয়সা হামারা আপনা নেহি কিসিকা বাপকা, কথাটা মনে ধরেছে মানুষের। গ্রামের মানুষ দেখেন পঞ্চায়েতের টাকা মানেই চুরি আর তাঁরাই দেখছেন সাংসদ তহবিলের টাকায় পর পর প্রকল্প। তাই প্রত্যাশাও বেশি’, বলেছেন মহম্মদ সেলিম। মানুষের জনজীবনের সঙ্কট, ফসলের দাম না পাওয়া, কাজ না থাকার খতিয়ানই মানুষ বলছেন তাঁদের সাংসদকে। ‘শুধু সাংসদ তহবিলের টাকায় সব সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। ফসলের দামের জন্য, কাজের জন্য, গাঁয়ের ছেলেদের গাঁয়েই থাকার জন্য প্রয়োজন সাধারণ মানুষের কথা শুনবে এমন সরকারের। বিজেপিকে হারাতে হবে দেশে, তৃণমূলকে হারাতে হবে রাজ্যে। আমাদের এককাট্টা হয়ে থাকতে হবে গ্রামে গ্রামে, লোকসভায় অনেক লাল ঝান্ডার সাংসদকে পাঠাতে হবে যাতে নতুন সরকার ধর্ম নিয়ে জাত নিয়ে রাজনীতি না করে,যাতে নতুন সরকার আপনাদের কথা শোনে, আপনাদের কাজ করে’, সহজ সরল ভাষায় বিকল্প ধর্মনিরপেক্ষ সরকার গড়তে লাল ঝান্ডাকে জয়ী করার আহ্বান জানিয়েছেন সেলিম। পালটা প্রত্যুত্তরে শুধু হাততালি দিয়ে থামেনি জগদীশপুর, কৃষ্ণমুড়ি বা মহীগ্রাম। এবার ভোটে লুট হবে না, তৃণমূলও সাহস পাবে না, চিৎকার করেই জানান দিয়েছে একের পর এক জনপদ। গণশক্তি