টিডিএন বাংলা ডেস্ক : হানাহানি নেই। নেই কোনও বিবাদ। কেউ বিপদে পড়লে একে অন্যের পাশে থাকেন। এমনই একটি গ্রাম নদীয়ার থানারপাড়ার নতিডাঙা। হিন্দু–মুসলিম দুই সম্প্রদায়ের মানুষ পরস্পরকে সাহায্য করেন। রবিবারেও যেমন প্রতিবেশী সুলেখা শীলের মরদেহ সৎকারে উজ্জ্বল ভট্টাচার্য, প্রভাস মণ্ডলের সঙ্গে কোমর বেঁধে চাদা তুলে শ্মশানযাত্রী হলেন মহিরুদ্দিন মল্লিক, লতিফ মণ্ডল, সম্রাট শেখ, সাহাবুদ্দিন ও মুজিবর শেখরা।
নতিডাঙার মৈত্রপাড়ার বধূ সুলেখা শীল (৪৭) হৃদ্‌রোগে মারা যান। ছুটে আসেন লতিফ মণ্ডল। দুঃস্থ শীল–‌পরিবারের কাছে সৎকারের টাকা ছিল না। মুকলেস মণ্ডল, লতিফ মণ্ডল ও উজ্জ্বল ভট্টাচার্য চাদা তুলে সৎকারের ব্যবস্থা করেন। স্থানীয় সরস্বতী প্রামাণিক, ফিরোজা বিবি বা তমন্না বিবিরা সমস্বরে জানান, ‘‌এখানে হিন্দু–‌মুসলিমে কোনও ভেদাভেদ নেই। যে যঁার নিজের ধর্ম পালন করেন। হিন্দু বা মুসলিম, আমরা কিন্তু সকলেই নিজেদের মানুষজাতি বলে মনে করি। বেশ কয়েক পুরুষ আগে থেকে এখানে দুই সম্প্রদায়ের মানুষ পাশাপাশি বাস করছি। সকলে সকলের বাড়ির বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যোগ দেন। যে–‌কেউ বিপদে পড়লে, তার পাশে দাড়ান সবাই।’‌
লতিফ মণ্ডল বলেন, ‘‌মৃতের পরিবারের পাশে দাড়িয়েছি মাত্র। সৎকারের জন্য টাকার প্রয়োজন ছিল। তাই সকলে মিলে ঘুরে ঘুরে প্রায় সাড়ে এগারো হাজার টাকা তুলি। গাড়ি ভাড়া করে মৃতদেহ নিয়ে গিয়ে বহরমপুর শ্মশানে সৎকার করে ফিরেছি। শ্মশানযাত্রীর মধ্যে প্রায় বারোজন মুসলিম ছিলাম। আমি নিজের হাতে এদিনের যাবতীয় খরচ করেছি। বাড়ি ফিরে বাড়তি তিন হাজার টাকাও মৃতার ছেলে ঈশ্বর শীলের হাতে তুলে দিয়েছি।’‌ এই পাশে থাকার ঘটনায় বিন্দুমাত্র অবাক হচ্ছেন না লতিফ।
তঁার কথায়, ‘‌এদিনের ঘটনাই প্রথম নয়। বাপ–‌ঠাকুরদার সময় থেকে এই সম্প্রীতি দেখে আসছি। বিপদগ্রস্ত যে–‌কোনও মানুষের পাশে থাকাই সব মানুষের ধর্ম। আমাদের ইদ কিংবা মহরমে যেমন হিন্দুদের সহযোগিতা থাকে, তেমনই পুজো‌পার্বণেও জড়িয়ে থাকেন মুসলিমরা। জাতি–‌ধর্মের নামে গন্ডগোল অবিলম্বে বন্ধ হওয়া উচিত।’‌
উজ্জ্বল ভট্টাচার্য বলছিলেন, ‘‌দুই সম্প্রদায়ের মানুষ পাশাপাশি বাস করি। খুব ছোট থেকেই সবাই এক সঙ্গে খেলাধুলো করে বড় হয়েছি। ধর্মের বিভেদ আজও বুঝি না। মুসলিমরা যেমন এদিন আমাদের সঙ্গে শ্মশানে সৎকার করে ফিরেছে, তেমনই এখানে হিন্দুরাও মুসলিমদের কবরে মাটি দিয়ে মৃতের আত্মার শান্তি কামনা করে। পাড়ার দুর্গাপুজো কমিটিতে থাকেন মুসলিমরা। আমরা কেউ জাতপাত মানি না।’‌
মৃত সুলেখার স্বামী ইন্দ্রজিৎ শীল জানালেন, ‘‌সুলেখা নতিডাঙা অমিয় স্মৃতি বিদ্যালয়ে মিড–ডে মিল রান্নার কাজ করতেন। দু’‌বছর ধরে অসুস্থ ছিলেন। রবিবার দুপুরে হঠাৎ হৃদ্‌রোগে মারা যান। খবর শুনেই এলাকার সকলে ছুটে আসেন। তঁারাই সকলের কাছে চাদা তুলে স্ত্রীকে সৎকার করতে গিয়েছিলেন। এলাকার দুই সম্প্রদায়ের মানুষ আমাদের পাশে দাড়িয়েছেন। সকলের প্রতি আমরা কৃতজ্ঞ। এমন ভাবেই যেন সকলে মিলেমিশে থাকেন।’ (সূত্র : আজকাল)