টিডিএন বাংলা ডেস্ক: রবিবার ষষ্ঠ দিনেও এনআরএস সহ রাজ্যের একাধিক হাসপাতালে অচলাবস্থা অব্যাহত। সমস্যার শুরুর দিন থেকেই শুধুমাত্র জুনিয়র চিকিৎসকদের দেখা গিয়েছে মিডিয়ায়। গলার শিরা ফুলিয়ে চিৎকার করে নিরাপত্তা দাবি করছেন তারা। ট্যাংরা থেকে নাকি দ’লরি ভর্তি দুর্বৃত্তরা এসে ডাক্তারবাবুদের একতরফা নির্মমভাবে পিটিয়ে ছিল। ডাক্তারবাবুদের সমবেত চিৎকারে ঢাকা পড়ে যাচ্ছিল মৃত মোঃ সাঈদের পরিবারের বক্তব্য। ট্যাংরার বিবিরবাগানের বাসিন্দা মৃত মুহাম্মদ শাহিদের পরিবারের কথা মিডিয়া প্রথমদিকে একেবারেই তুলে ধরেনি। ডাক্তার পরিবহ মুখোপাধ্যায় গুরুতর আহত হওয়ায় সকলেরই সহানুভূতি জুনিয়র ডাক্তারদের দিকে চলে যায়। ঘটনার আদ্যোপান্ত খতিয়ে দেখার চেষ্টাই হয়নি।

রবিবার পুবের কলম পত্রিকার পক্ষ থেকে এই প্রতিবেদক বিবিবাগানে মৃতের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করতে গেলে উঠে আসে একাধিক চাঞ্চল্যকর তথ্য। মৃত মুহাম্মদ শাহিদের ছোট ছেলে মোহাম্মদ সাব্বির বলেন, গত ৯ জুন আমার আব্বুকে শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যায় এনআরএসে ভর্তি করি। তারপর আমার বোনেরা সেখানে আব্বুকে দেখতে যায়। সোমবার বিকেলে তারা এনআরএসে গিয়ে দেখে নিস্তেজ হয়ে পড়ে রয়েছে আব্বু। চলছে স্যালাইন। গত সোমবার তখন সন্ধ্যা পাঁচটা-ছয়টা হবে। আব্বুর মুমূর্ষু অবস্থায় পৌঁছে যাচ্ছে আন্দাজ করে কর্তব্যরত ডাক্তারদের ডাকতে যায় আমার দুই ভাই। কিন্তু চিকিৎসকরা মোটেই আমল দেননি। তাদের একজন সিগারেট খেতে খেতে অন্য একজনকে ডাকতে বলেন। সেইজন আবার বলেন অন্য জনের কথা। তখন কি করব ঠিক করতে না পেরে আমার এক ভাই কালিম একজন ডাক্তারবাবুর হাত ধরে টেনে আব্বুর বেডের সামনে নিয়ে আসে। তখনই জানা যায় আব্বু আর নেই। ওই দিন বিকাল পাঁচটা কুড়ি মিনিট নাগাদ তার মৃত্যু হয়।

কিন্তু মুমূর্ষ রোগীর প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য কর্তব্যরত চিকিৎসকদের হাত ধরে টানার কারণে বেজায় চটে যান ডাক্তাররা। পরে তা বুঝতে পারি। চিকিৎসকরা বলেন,রোগীর পরিবারের ওই সদস্যকে ক্ষমা চাইতে হবে। না হলে তারা লাশ হাসপাতাল থেকে ছাড়বেনা।

এরমধ্যেই পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। পুলিশের পক্ষ থেকেও ওই চিকিৎসককে বোঝানো হয়। তাতেও সমস্যা মেটেনি। উল্টে ঘোরালো পরিস্থিতি তৈরি হয়। পুলিশের পক্ষ থেকে আমাদের বলা হয়, চিকিৎসকদের বুঝিয়ে তারাই আমার আব্বুর লাশ আমাদের হাতে দেওয়ার ব্যবস্থা করে দেবেন। নীচে গিয়ে অপেক্ষা করতে বলে পুলিশ।

তারপর হাসপাতালের নিচে আমরা কয়েকজন ঘন্টাখানেক অপেক্ষা করি। কিন্তু পুলিশ জানায়, চিকিৎসকরা দেহ ছাড়তে নারাজ। চিকিৎসকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়,যে দুজন চিকিৎসকের সঙ্গে খারাপ আচরণ করেছে তাদেরকে ক্ষমা চাইতে হবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেখি জুনিয়র চিকিৎসকরা সেখানে জড়ো হচ্ছেন। ততক্ষনে আব্বুর লাশ নিতে আমাদের পাড়া থেকে ম্যাটাডোর এসে পৌঁছায়। আব্বু আমাদের পাড়ায় একজন পরিচিত ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তাই লরিতে নয়,একটি ম্যাটাডোরে প্রায় ২৫-৩০ জন পরিজন ও পরিচিতেরা আব্বুর লাশ নিয়ে যাওয়ার জন্য এসেছিলেন। আমাদের ধর্মে লাশ নিয়ে আসা এবং জানাজায় শরিক হওয়া পূণ্যের বা সওয়াবের কাজ বলে বিবেচিত হয়। আমরা পরে আশ্চর্য হয়ে শুনলাম, আমরা নাকি মারামারি করার জন্য দুই ট্রাক ভরে ২০০ গুন্ডাকে হাসপাতালে নিয়ে এসেছি! কি জানি কি করে তারা গুনে গুনে বলে দিল ২০০ লোক এসেছিল। ৩০০ বা ১০০ নয়।আর একটা ম্যাটাডোর কি জাদুর গুনে ২ টা লরি হয়ে গেল তাও বুঝতে পারছি না!

তিনি আরও প্রশ্ন তোলেন, যার পরিবারের কারো মৃত্যু হয় সে কি হামলার ছক কষে? সে তো বরং প্রিয়জনের লাশ দাফনের ব্যবস্থা এবং তার জন্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতেই ব্যস্ত থাকে। কিন্তু দেখি, লাশ না ছেড়ে উল্টা বরং রাত বাড়তেই জুনিয়র চিকিৎসকরা ফোনাফুনি শুরু করেন। ডেকে আনেন শতাধিক জুনিয়র চিকিৎসককে। পুলিশ পরিস্থিতি আঁচ করতে পেরে বিশাল সংখ্যক বাহিনী মোতায়েন রেখেছিল। কিন্তু তা সত্বেও জুনিয়র চিকিৎসকরা আমাদের মারতে শুরু করেন। একটা সময় হাতে ইঞ্জেকশনের সিরিঞ্জ, লোহার রড, তালা নিয়ে তেড়ে আসেন আমাদের এক প্রতিবেশী স্কুটার নিয়ে একজনকে দেখতে গিয়েছিলেন। তাকেও ধরে মারধর করা হয়। পুলিশ বাধা দিচ্ছিল। কিন্তু জুনিয়র ডাক্তাররা তোয়াক্কা করছিলেন না। শেষ পর্যন্ত সেই প্রতিবেশি গ্রেপ্তারও হয়েছে। যার সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই। হাসপাতাল চত্বর থেকে সকলে ভয়ে পালিয়ে গেলেও বাইরে ট্রাম লাইনের কাছে এসেও মারপিট করেন জুনিয়র চিকিৎসকরা। আর সেই সময়েই একজন জুনিয়র চিকিৎসক গুরুতর আহত হন। তার পরের ঘটনা সকলের জানা। আমরা ওই জুনিয়র চিকিৎসকের দ্রুত আরোগ্য কামনা করি। আমার আব্বু চিকিৎসার গাফিলতিতে মারা গেছেন। শেষ সময়ে কেউ তাকে দেখেননি। প্রায় এক ঘন্টা ধরে কত অনুনয়-বিনয় করেছিলাম। তবে আমি এবং আমার পাড়ার লোকেরা কখনোই চাইনা মানুষ অসুবিধায় পড়ুক। আমি সেদিনও চিকিৎসকদের কাছে ক্ষমা চেয়েছিলাম। আজও আপনাদের মাধ্যমে চাইছি। শুধু একটাই আবেদন সাধারণ মানুষের সমস্যা অনুধাবন করুন। রোগীদের চিকিৎসা করুন। পরিষেবা শুরু করুন। শুধু মোহাম্মদ সাব্বিরই নয়, জামা মসজিদ সংলগ্ন এলাকাবাসীও একই দাবি করলেন, সমস্ত হাসপাতালে চিকিৎসা পরিষেবা স্বাভাবিক হোক। আমার আব্বার মতো পরিণতি যেন আর কারও না হয়।

তবে আমাদের একটা দাবি রয়েছে। আপনারা সবাই নিউজ চ্যানেলের ভিডিওতো দেখেছেন, কি নির্মম ভাবে ডাক্তারবাবুরা শোকার্ত পরিবারের এক সদস্যকে মাটিতে ফেলে নৃশংসভাবে তার বুক ও মুখে একের পর এক ঘুসি মেরে চলেছেন। পুলিশ সময় মতো টেনে না সরালে ডাক্তারবাবুদের ঘুষিতে হয়তো তার মৃত্যু ঘটতো। আমরা ওই হামলাকারী ডাক্তার বাবুদের বিচার চাই। (সূত্র: পুবের কলম)