টিডিএন বাংলা ডেস্ক: যখন না খেতে পেয়ে, বিনা চিকিৎসায় জঙ্গলমহলে আদিবাসী শবরদের মৃত্যু হচ্ছে তখনই খাদ্য উৎসবে মেতেছে রাজ্যের তৃণমূল সরকার। ক্লাবে বিলি করা ভিক্ষে নয়, ন্যায্য সম্মান ও ন্যায্য অধিকার আদায় করা হবে লড়াই আন্দোলনের পথেই। জঙ্গলমহলসহ রাজ্যের নানা প্রান্ত থেকে উঠে আসা আদিবাসী, দলিতরা খোদ রাজ্যের রাজধানীর বুকে দিনভর সমাবেশ করে এই হুঁশিয়ারি দিলেন। পশ্চিমবঙ্গ সামাজিক ন্যায় মঞ্চ, পশ্চিমবঙ্গ আদিবাসী অধিকার মঞ্চ এবং পশ্চিমবঙ্গ আদিবাসী ও লোকশিল্পী সঙ্ঘের যৌথ উদ্যোগে এদিন ধর্মতলায় লেনিন মূর্তির পাদদেশে বিক্ষোভ সমাবেশ সংগঠিত হলো।

সব রং উঠোন পেতেছিল লেনিন মূর্তির পাদদেশে। ডম্বরু, ঢাক, ঢোল, দুন্দুভি আরও নানা বাদ্যযন্ত্রের মূর্ছনা তাল ঠুকছিল। তারসঙ্গেই নাচ, কখনওবা বাউল গানের দুলুনি। কিন্তু রং, সুর, তালের এমন জলুসে ক্ষোভের আগুনে আঁচের এতটুকু খামতি ছিল না। মঙ্গলবার সকাল দশটা থেকেই লেনিন মূর্তির পাদদেশ এমন নানা রঙের মেলায় রঙিন। প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চল থেকে উঠে আসা কালো আদিবাসী দলিত মানুষেরা সঙ্ঘবদ্ধ হয়েই সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান মেলে ধরেছিল প্রতিবাদী এমন প্রাঙ্গণে। মঞ্চে বাউল গান, তো এপাশে ওপাশে সারিবদ্ধ সাঁওতালি নাচ, আবার কখনও বা মঞ্চের সামনের উঠোনে আদিবাসীদের নানা কৃৎকৌশলে জীবনের ঝুঁকি নেওয়া খেলার প্রদর্শন। বেলা ২টো পর্যন্ত এভাবেই চলল লেনিন মূর্তির পাদদেশে আদিবাসী লোকশিল্পীদের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এদিন লেনিন মূর্তির তলায় আদিবাসীদের বাউল গানের কলি বলে উঠল—‘পরো না ধর্মেরই ঐ ঘোমটা / যা দিয়ে যায় না ঢাকা বিভেদেরই মনটা’।

মঙ্গলবার লেনিন মূর্তির পাদদেশে আদিবাসী লোকশিল্পীদের এই সমাবেশে দলিত শোষণ মুক্তি মঞ্চের সর্বভারতীয় সম্পাদক রামচন্দ্র ডোম বললেন, বাবা সাহেব আম্বেদকরের সংবিধান আজ আক্রান্ত। শুধু ধর্ম, জাত-পাত, সম্প্রদায়ের ওপর নয়, আক্রমণ চলছে পেটের ভাত, রুটিরুজির ওপরে। আক্রমণ চলছে জমির অধিকারের ওপরেও। আদিবাসীদের এই ক্ষোভের সমাবেশে তিনি বললেন, রাজ্যে আজ থেকে খাদ্য উৎসব শুরু। এক সপ্তাহ ধরে চলবে নানা সুস্বাদু খাদ্যের ভূরিভোজ। এই সরকারের লজ্জা নেই, যখন জঙ্গলমহলে না খেতে পেয়ে, চিকিৎসার অভাবে একের পর এক আদিবাসী শবরদের মৃত্যু হচ্ছে তখন খাদ্য উৎসবে মেতেছে রাজ্যের তৃণমূল সরকার। মুখ্যমন্ত্রীর জঙ্গলমহল নাকি হাসছে। লালগড়ে এক মাসে ৮জন আদিবাসী শবরের মৃত্যু হয়েছে। যে পূর্ণাপানি গ্রামে লোধা, শবরদের বসবাস তাঁরা সংখ্যায় নগন্য। কিন্তু এই আদিবাসীদের জন্যই ভারত সরকারের এবং রাজ্য সরকারের ন্যায্য আইনি সুরক্ষা রয়েছে। নানা প্রকল্পের সুবিধা তাঁদের ন্যায্য পাওনা, কিন্তু জঙ্গলমহলে কিছুই মেলে না। পশ্চিমবঙ্গ আদিবাসী অধিকার মঞ্চের সংগঠক পুলিনবিহারী বাস্কেও এদিন বললেন, পূর্ণাপানিতে শুধু খাবার নয়, পরিস্রুত পানীয় জলের জোগান পর্যন্ত নেই। একশো দিনের কাজ মেলে না, এমন খাদ্যহীন উপত্যকায় এখন আদিবাসী শিল্পীদের ভাড়া করে নাচাগানা করাচ্ছে রাজ্যের তৃণমূল সরকার। এদিন সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন সামাজিক ন্যায় মঞ্চের সভাপতি অধ্যাপক বাসুদেব বর্মণ।

পশ্চিমবঙ্গ সামাজিক ন্যায় মঞ্চের সাধারণ সম্পাদক অলকেশ দাস সমাবেশে বললেন, ভোটের দিকে তাকিয়ে রয়েছে এরাজ্যের শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস আর কেন্দ্রের শাসক বি জে পি। ভোট লুটতেই এখন মুখ্যমন্ত্রী নমশূদ্র মতুয়া সেজেছেন। একসময় এরকমই ভোটের দিকে তাকিয়ে পাহাড়ে ১৫টি কমিটি গড়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। রাজবংশী, নেপালী, গোর্খা, লেপচাদের নিয়েও ভোট রাজনীতি করা হয়েছিল। রাজ্যের এই তৃণমূল সরকারের শিক্ষামন্ত্রী আদিবাসীদের অসম্মানিত করে বলেন আদিবাসী ছাত্রছাত্রীরা নাকি পড়াশোনা করার জন্য স্কুল, কলেজে যায় না। তারা ভাতা পাওয়ার লোভে যায়। কেন্দ্রের মোদী সরকারের চরিত্র তুলে ধরে তিনি বললেন, রামমন্দির গড়ার জন্য মোদীর দলবল আদিবাসীদের টাকা সংগ্রহ করার ডাক দিয়েছে। কিন্তু এই মন্দির যখন তৈরি হয়ে যাবে তখন সেই মন্দিরে কোনও আদিবাসী দলিতদের ঢোকার অনুমতি মিলবে না। পশ্চিমবঙ্গ আদিবাসী অধিকার মঞ্চের সাধারণ সম্পাদক রবীন্দ্রনাথ হেমব্রম এদিন বললেন, আদিবাসীদের লজ্জা রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী সিধু, কানহুকে স্মরণ করার অনুষ্ঠানে ‘ডহরবাবু’র খোঁজ করেন। রাজ্যে সাঁওতালি ভাষার শিক্ষক নিয়োগ আজও হলো না। আদিবাসী ছেলেমেয়েদের ভাতা বন্ধ হচ্ছে। মঙ্গলবার এই আদিবাসী সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন ঝাড়খণ্ডের দলিত শোষণ মুক্তি মঞ্চের নেতা শিশু বালক পাশোয়ান। সমাবেশে রামচন্দ্র ডোম বললেন, নানা অজুহাতে দেশের নানা রাজ্যেই আদিবাসী দলিতদের জমি থেকে উৎখাত করা শুরু হয়েছে। ঝাড়খণ্ডে আদিবাসীদের জমি থেকে উচ্ছেদ করতেই অর্ডিন্যান্স জারি করেছিল। জমির আন্দোলনে পিছু হটতে বাধ্য হয়েছে সেই রাজ্যের সরকার।

এদিন আদিবাসী লোকশিল্পী সঙ্ঘের রাজ্য সভাপতি মুজফ্‌ফর হোসেন সমাবেশে বললেন, আমাদের লড়াইয়ে তির ধনুক লাগে না। সুর, বাদ্যযন্ত্রের আওয়াজ, নাচের মধ্য দিয়েই লড়াইয়ে দাবি আদায় করি। সংগঠনের সম্পাদক শংকর মুখোপাধ্যায় বললেন, রাজ্যে এমনই একটি ব্লকের আধিকারিক আদিবাসী লোকশিল্পীদের পরিচিতিপত্র দিচ্ছিলেন না। শেষমেশ আদিবাসীরা সমবেত ঢাকের বাজনা বাজাতে ব্লক আধিকারিক পরিচিতিপত্র দিতে বাধ্য হলেন। রাজ্যের তৃণমূল সরকার আদিবাসী লোকশিল্পীদের লালনের গান বাদ দিয়ে ধর্মে ধর্মে বিভেদের গান গাইতে বলছে। শাসকের নির্দেশ মুখ্যমন্ত্রীর স্তুতির গান গাইতে হবে তবেই নাকি আদিবাসী লোকশিল্পীদের পরিচিতিপত্র জুটবে। মুজফ্‌ফর হোসেন বললেন, মুর্শিদাবাদে কয়েক হাজার লোকশিল্পী সমাবেশ করেই আন্দোলনের অনুমতি আদায় করে নিয়েছেন। এদিন আদিবাসী লোকশিল্পীদের সমাবেশে এছাড়াও বক্তব্য রেখেছেন আদিবাসী অধিকার মঞ্চের দেবলীনা হেমব্রম, রামলাল মুর্মু প্রমুখ।