টিডিএন বাংলা ডেস্ক: যা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন মমতা ব্যানার্জি, তার কিছুই পূরণ করতে পারেননি। তাই সোমবার রাজ্যের রেলপথ, জাতীয় সড়ক অবরোধ করলেন আদিবাসীরা।

৯টি দূরপাল্লার ট্রেন আটকে গেল। অনেকগুলির সময়সূচি বদলে গেল। দুটি জাতীয় সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে গেল। থমকে গেল রাজ্যের বিস্তীর্ণ এলাকা। রাজ্যের আদিবাসী উন্নয়নমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। দপ্তরের রাষ্ট্রমন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য। মুখ্যমন্ত্রী ইতালিতে। আর এদিন সন্ধ্যায় রাষ্ট্রমন্ত্রী ব্যস্ত ছিলেন বেসরকারি চ্যানেলের টক শো-তে। জঙ্গলমহলে তৃণমূল কংগ্রেসের দুই আদিবাসী বিধায়ক সুকুমার হাঁসদা, দুলাল মুর্মু এদিনের আন্দোলন নিয়ে একটি কথাও বলতে চাননি।

জঙ্গলমহলসহ রাজ্যের পাঁচটি জেলায় এদিন ভোর ছটা থেকে রাস্তা, রেলপথ অবরোধ শুরু করেন আদিবাসীরা। তাঁদের দাবি— অলচিকি হরফ জানা সাঁওতালি ভাষার শিক্ষক নিয়োগ করতে হবে স্কুলগুলিতে। মুখ্যমন্ত্রী ২০১১-র জুলাইয়ে ঝাড়গ্রামের সভায় ঘোষণা করেছিলেন এই নিয়োগ তাঁর সরকার করবে। কিন্তু সাত বছরেও হয়নি সেই নিয়োগ। যে কজন নিয়োগ হয়েছেন তাঁদের অধিকাংশ জনই আদিবাসী নন। তার চেয়েও বড় কথা তাঁরা কেউই অলচিকি হরফ জানেন না। শুধু তাই নয়, এই সবই হয়েছে অস্থায়ী নিয়োগ। আদিবাসীদের আরও অভিযোগ, সাঁওতালি ভাষার বইও আসেনি স্কুলগুলিতে। সরকারও বই ছাপেনি। আদিবাসীদের আরও অভিযোগ, গত সাত বছরে আদিবাসী ছাত্রছাত্রীদের শিক্ষার পরিকাঠামোগুলির ক্ষতি হয়েছে। হস্টেলের সুযোগ সুবিধা কমেছে। ভাতা অনিয়মিত হয়েছে। এমনকি যাঁরা আদৌ আদিবাসী নয়, তাঁরা আদিবাসী শংসাপত্রও পেয়ে যাচ্ছেন বলে তাঁদের অভিযোগ। আদিবাসীদের ধর্মীয় স্থানের পাট্টাও তাঁদের অন্যতম দাবি। প্রসঙ্গত, আদিবাসী অধিকার মঞ্চের পক্ষ থেকে এই আন্দোলনকে সমর্থন জানিয়ে বলা হয়েছে, বনাঞ্চলসহ বিভিন্ন জায়গায় আদিবাসীদের চাষ, বসবাসের পাট্টা থেকেও উৎখাত করা হয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের আমলে।

আদিবাসীদের ক্ষোভের আঁচ পেয়েছিল শাসকদল, গত পঞ্চায়েত নির্বাচনে। তাতে মলম লাগাতে গত ৬ই জুলাই নবান্নে মুখ্যমন্ত্রী রাজ্যের ১২টি জেলা থেকে বাছাই করা আদিবাসীদের নিয়ে বৈঠক করেন। একটি কোর কমিটি তৈরি করে দেন। তার আহ্বায়ক করা হয় ঋতব্রত ব্যানার্জিকে। সব আদিবাসীরা প্রয়োজনে যাতে সমস্যা জানাতে পারেন তার জন্য একটি হোয়াটস অ্যাপ নম্বর চালুর সিদ্ধান্ত ঘোষিত হয়। কিন্তু সমস্যার যে কোনও সমাধান রাজ্য সরকার করতে পারেনি তার প্রমাণ এদিনের আন্দোলন। এদিন সন্ধ্যায় বেশিরভাগ জায়গায় অবরোধ তুলে নেওয়া হয়। আন্দোলনকারীরা জানান, আগামী ২৮শে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময় চেয়েছে রাজ্য সরকার। তার মধ্যে সমস্যার সমাধান না হলে অনির্দিষ্টকালের জন্য অবরোধের পথে যাবেন তাঁরা।

ভারত জাকাত মাঝি পারগানা মহল, আদিবাসী স্যোশিও এডুকেশনাল অ্যান্ড কালচারাল অ্যাসোসিয়েশন এই আন্দোলনের আহ্বান জানায়। তবে আন্দোলন শুধু আয়োজকদের সমর্থকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। দলমত নির্বিশেষে অনেক আদিবাসীই এদিনের আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। রাজ্যের আদিবাসী অধিকার মঞ্চও এই আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানায়। সংগঠনের সম্পাদক পুলিনবিহারী বাস্কে এদিন ঝাড়গ্রামের সাঁকরাইলে এক পদযাত্রায় থাকাকালীন বলেন,‘‘আমাদের নৈতিক সমর্থন আছে। স্কুলগুলিতে অলচিকি হরফ জানা সাঁওতালি ভাষার শিক্ষক নিয়োগসহ শিক্ষাক্ষেত্রের একাধিক দাবির পক্ষে আমরাও ঝাড়গ্রাম জেলাজুড়ে পদযাত্রা করছি। এছাড়া যেভাবে আদিবাসীদের জমি কেড়ে নেওয়া হচ্ছে তারও বিরোধিতা করছি আমরা।’’

এদিন সকালে পুলিশ প্রথমে চেষ্টা করে আদিবাসীদের রেলপথ ও সড়ক থেকে সরিয়ে দিতে। কিন্তু পারেনি। আন্দোলনকারীদের মেজাজ বুঝে পুলিশ নিষ্ক্রিয় অবস্থানে চলে যায়। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, মালদহ, পশ্চিম মেদিনীপুর, বাঁকুড়া, ঝাড়গ্রাম, পুরুলিয়ার প্রায় ২৫টি জায়গায় অবরোধ হয়। ঝাড়গ্রাম জেলার খেমাশুলি, সরডিহা, গিধনী, পশ্চিম মেদিনীপুরের বালিচক, জকপুর, শালবনী, নারায়ণগড়ের নেকুড়সোনী, বাঁকুড়ার বিষ্ণুপুর প্রভৃতি জায়গায় রেল অবরোধ হয়। অন্যদিকে অবরুদ্ধ হয় সড়কপথও। ৬নং জাতীয় সড়কের উপর আষাঢ়ী, মেছোগ্রাম, খেমাশুলী, ৬০নং জাতীয় সড়কের উপর নেকুড়সোনী, শালবনী, গোদাপিয়াশাল, লালপুর ছাড়াও, পুরুলিয়ার মানবাজারে, কুমারী সেতু, হরিডি, কোটশিলা, কুইলাপালের মতো অনেকগুলি জায়গায় অবরোধ করেন আদিবাসীরা। তাঁদের হাতে কোথাও ছিল সংস্কৃতির প্রতীক তীর ধনুক, কোথাও ছিল ধামসা-মাদল। পুরুলিয়ার কোথাও রেল অবরোধ না হলেও বাঁকুড়া, ঝাড়গ্রাম, পশ্চিম মেদিনীপুরে রেল অবরোধের প্রভাব সেখানে পড়ে। ফলে হাওড়া-পুরী শতাব্দী এক্সপ্রেস, হাওড়া-ভূবনেশ্বর জনশতাব্দী এক্সপ্রেসসহ ৯টি ট্রেন বাতিল হয়। এছাড়া ১৪টি ট্রেনের যাত্রাপথ সংক্ষিপ্ত হয়। মালদহের গাজোলেও কিছুক্ষণ ট্রেন অবরোধ হয়। বাঁকুড়ায় ছাতনা স্টেশনে অবরোধের ফলে ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এবছর একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হওয়া ছাত্রছাত্রীরা এখনও পর্যন্ত এই মাধ্যমের কোন বই পায়নি। রানিবাঁধ ও শুশুনিয়ার চাঁতরা হাইস্কুলে সাঁওতালি মাধ্যমে বিজ্ঞান বিভাগ চালু হলেও তার বইপত্র থেকে শুরু করে কোন পরিকাঠামো গড়ে ওঠেনি। অসহায় বোধ করছে ছাত্রছাত্রীরা। বারে বারে বিদ্যালয় শিক্ষাদপ্তরকে জানানো সত্ত্বেও কোন কাজ হয়নি। এছাড়াও অরণ্যের পাট্টা দেওয়ার দাবিটিও এদিন তোলা হয়েছে। তোলা হয়েছে আদিবাসীদের পেনশনের বিষয়টিও। এদিন বাঁকুড়া জেলার তালডাংরার শিবডাঙ্গা, বাঁকুড়ার হেভিরমোড়, সারেঙ্গার পিড়লগাড়ি, রানিবাঁধ, পাত্রসায়ের, কোতুলপুরসহ একাধিক জায়গায় অবরোধ হয়। অবরোধের ফলে বিভিন্ন এলাকায় বহু গাড়ি আটকে যায়। সন্ধ্যায় পথ অবরোধ তুলে নিলে সেই গাড়ি চলাচলে বেশ কিছুক্ষণ যানজট তৈরি হয়।
Attachments area