টিডিএন বাংলা ডেস্ক: নিছক পতাকা খোলা নিয়ে সংঘর্ষ? নাকি স্রেফ একটা বুথে হারার জন্য তৃণমূলের এহেন মরিয়া আক্রমণ? কিংবা একটা বুথে জিতেই বিজেপি এতটা আগ্রাসী যে তৈরি করল এমন সশস্ত্র সংঘর্ষের পরিবেশ? সন্দেশখালির ঘটনা স্বাভাবিকভাবেই বাড়াচ্ছে ধোঁয়াশা। তবে গত ৪৮ ঘণ্টা জুড়ে সন্দেশখালি, বসিরহাটের পরিস্থিতি, কেন্দ্র-রাজ্য দুই শাসক দলের মনোভাব, কাণ্ডকারখানায় স্পষ্ট, একেবারে চিত্রনাট্য মেনেই তৈরি করা হয়েছে এমনতর পরিবেশ। স্পষ্ট ভাগাভাগি। যা দু’দলকেই দিচ্ছে মুনাফা। বলি হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। বিস্তীর্ণ এলাকায় মাছের ভেড়ি। একাধিপত্য তৃণমূলের। গত লোকসভা নির্বাচনের পরে মাছের ভেড়ি দখল নেওয়া দুষ্কৃতীরাও এখন জার্সি বদলে বিজেপি’তে। রাশ আলগা হচ্ছে। শুধু ভোটের অঙ্কে নয়, লুটের অঙ্কেও। সন্দেশখালি-১ নম্বর ব্লকের হাটগাছি গ্রাম পঞ্চায়েতের ভাঙ্গিপাড়াতেও একসময় ছিল তৃণমূলের শক্ত জমি। গত একবছরে সেই জমি দুর্বল হয়েছে। গ্রামে তৃণমূলী মাতব্বর নিহার মণ্ডল ছিলেন ভাঙ্গিপাড়ার শেষ কথা। কিন্তু সেই গ্রামেই নির্বাচনে বিজেপি জিতেছে। ফলে মাছের ভেড়ির নিয়ন্ত্রণ, কোটি কোটি টাকার লেনদেনের রাশ যাচ্ছে বিজেপি’র হাতে। ফলে ভাঙ্গিপাড়ার ঘটনা অনিবার্য হয়ে উঠেছিল বলে মানছেন গ্রামবাসীরাও। দুষ্কৃতীদের দল বদল ঘটেছে। তাই সংঘর্ষের চেহারাও আরও তীব্র হয়েছে। খাস সন্দেশখালি-১ নম্বর ব্লকের বিস্তীর্ণ এলাকার সাধারণ মানুষ শঙ্কায় প্রহর গুনলেও গোটা ঘটনার ব্যপকতা নিয়ে বিস্মিত নন। সাধারণ গ্রামবাসী থেকে শুরু করে, দোকানদার, অটোচালক, ভ্যানচালকদের স্পষ্ট কথায়, টাকার বখরার দখল নিয়ে লড়াই। সাধারণ মানুষের স্বার্থে এসব তো হচ্ছে না। দু’দলই এখন দুষ্কৃতীদের ওপর নির্ভরশীল। দু’দলের হাতেই বিপুল পরিমাণ অস্ত্র। আর এখানেই প্রশ্ন উঠছে পুলিশের ভূমিকা কী? কীভাবে এত বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ঢুকল গ্রামে গ্রামে? কোথায় নজরদারি? নতুন পুলিশ জেলা করেই বা কী লাভ হয়েছে? ভাঙ্গিপাড়া গ্রামের বাসিন্দাদের অভিযোগ মারাত্মক।

সশস্ত্র অবস্থায় হামলা চলেছে পুলিশের সামনেই। এমনকি নিহতের পরিবারের সদস্যরা পুলিশকে জানালেও পুলিশ কোন উদ্যোগ নেয়নি দুষ্কৃতীদের ঠেকাতে। ঘটনায় শেখ শাজাহানের পাশেই নাম এসেছে তৃণমূলনেতা বাবু মাস্টারের। তাঁর বাড়ি হাসনাবাদে। ভাঙ্গিপাড়ায় বুথ কমিটির সভায় হাসনাবাদ থেকে বাবু মাস্টারের বাহিনীকে কেন আসতে হয়েছিল ? ঘটনার পরে এখনও পর্যন্ত ন্যাজোট থানায় তিনটি এফআইআর দায়ের হয়েছে। একটি নিহত বিজেপি’নেতা প্রদীপ মণ্ডলের পরিবারের তরফে দায়ের করা হয়েছে। আরেকটি করেছে নিখোঁজ বিজেপি’কর্মী দেবদাস মণ্ডলের পরিবার। তৃতীয়টি করা হয়েছে রাজবাড়ি এলাকার বাসিন্দা নিহত তৃণমূলকর্মী কায়ুম মোল্লার পরিবারের তরফে। যদিও ঘটনার পরে ৪৮ ঘণ্টা পার হয়েছে। নিখোঁজ পাঁচজনের একজনকেও উদ্ধার করতে পারেনি পুলিশ। এমনকি তিনটি এফআইআরে উল্লেখ করা অভিযুক্তদের একজনকেও গ্রেপ্তার বা আটক করে উঠতে পারেনি জেলা পুলিশ। এরই মধ্যে চাঞ্চল্য তৈরি হয় গ্রামে।

গ্রামবাসীদের একাংশের দাবি ডাসা নদীতে একটি বস্তায় ভরা লাশ ভেসে দেখতে পেয়েছেন কয়েকজন মহিলা। যদিও সেটা উদ্ধার করা যায়নি। নিখোঁজের পরিবারের দাবি সেটা হয়তো ভাঙ্গিপাড়ার তৃণমূল-বিজেপি সংঘর্ষে কোনও নিহত ব্যক্তির দেহ। সন্দেশখালির ভয়াবহ ঘটনায় প্রতিবাদ বিজেপি’র তরফে বসিরহাট মহকুমায় এদিন বারো ঘণ্টার বন্‌ধ ডাকা হয়েছিল। সন্ত্রস্ত এলাকায় মোটামুটি প্রভাব পড়েছে। একাধিক জায়গায় জোর করে বন্‌ধ করার চেষ্টাও করেছে বিজেপি’ কর্মীরা। বাসন্তী হাইওয়েতে এদিন সকাল থেকে দফায় দফায় পথ অবরোধ করেন বিজেপি সমর্থকরা। টায়ার জালিয়েও রাস্তা অবরোধ করা হয়। মিনাঁখা, মালঞ্চে একাধিক জায়গায় গাছের গুড়ি ফেলে রাস্তা অবরোধ করে বিজেপি। পরিকল্পিতভাবে উত্তেজনা তৈরির খেলায় এখন বিজেপি। তবে এর মধ্যে সবচেয়ে তাৎপর্যের হলো বিজেপি’র ডাকা বন্‌ধে তৃণমূলের দখলে থাকা অটো, মোটরভ্যান, টোটো ইউনিয়নের সব গাড়ি এদিন বন্ধ ছিল। রাস্তায় নামেনি। বসিরহাটের ইটিন্ডা থেকে কলেজপাড়া, খোলাপোতা থেকে ৭২ নম্বর বাসস্ট্যান্ড, বসিরহাট চৌমাথা থেকে ভেবিয়া, মুরারীশা রুটের সব অটো টোটো এদিন বন্ধ ছিল। সব রুটে একাধিপত্য তৃণমূলের। তবুও কেন একটা অটো রাস্তায় বের হলো না? নির্বিকার তৃণমূল নেতারাও। পুলিশের খাতায় একাধিক অভিযোগ। সুন্দরবনের কাঠ চুরি থেকে মধু পাচার, গোরু পাচার, মাছের ভেড়ির কারবার— সবেতেই বেতাজ বাদশা শেখ শাজাহান। এই ব্যক্তিই এখন তৃণমূলের ব্লক সভাপতি। সন্দেশখালির ঘটনায় বিজেপি’র পাশাপাশি তৃণমূলের এই নেতার বিরুদ্ধে মূল অভিযোগ। রাজ্যের এক মন্ত্রীর অত্যন্ত ঘনিষ্ট। তৃণমূল সরকারের আসার পরেই এই ব্যক্তির এখন প্রাসাদপম বাড়ি। বাড়িতে সাতটি এসি মেশিন বসানো। একাধিক গাড়ি। সন্দেশাখালির সংঘর্ষ থেকে শুরু করে সন্দেশখালি-২নম্বর ব্লকে বিডিও নিগ্রহের ঘটনাতেও তাঁরই হাত।

এফআইআর’ও হয়েছে। যদিও পুলিশ নীরব দর্শকের ভূমিকায়। ঘটনার ফায়দা তুলতে ব্যস্ত বিজেপি। তৃণমূল এই ঘটনার প্রভাবে অন্য এলাকাতে জমি বাড়াতে তৎপর। দুই শাসক দলের স্রেফ তোলাবাজির সাম্রাজ্য দখলের পরিণামে কার্যত তছনছ হচ্ছে একের পর এক গ্রাম। বন্ধ যাবতীয় কাজকর্ম। শিকেয় উঠেছে চাষবাস। (সূত্র: গণশক্তি)