টিডিএন বাংলা ডেস্ক: এনআরএস এর আন্দোলন আর তার পর রাজ্য ব্যাপী সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসা হরতালের কথা বলছি।

ঘটনাচক্রে ওই দিন রাতে আমি নিজে ওখানে ছিলাম, জানি আমার কথা গুলো বিস্বাস হবে না, কারণ গোয়েবলসীয় সোশ্যাল মিডিয়ায় দৌলতে আপনার মাথায় এখন অন্য ছবি ভাসছে। খিস্তি করতে পারেন, কিন্তু তার জন্যে সত্যিটা মিথ্যে হয়ে যায় না।

‌সোমবার রাত এগারোটা, এনআরএস এর UNB বিল্ডিংএর সামনে উত্তেজনা। প্রচুর পুলিশ, মিডিয়া আর উত্তেজিত একদল মানুষ। যা জানতে পারলাম ট্যাংরা বিবিবাগানের বাসিন্দা মহ: শাহিদ নামে এক প্রৌঢ় মারা গেছেন ওই দিন সন্ধ্যে ৫.৪০ মিনিটে, কিন্তু তার দেহ ছাড়ছে না ওই হাসপাতলের জুনিয়র ডাক্তাররা।আরো শুনলাম ওই প্রৌঢ় রবিবার বিকেলে এনআরএস এর মেল মেডিকেল ওয়ার্ড এ ভর্তি হয়েছিলেন, চিকিৎসায় সাড়াও দিচ্ছিলেন। সোমবার দুপুরে রোগীর মেডিকেল রিপোর্ট দেখে চিকিৎসকরা নাকি সব ঠিক ঠাক আছে বলে জানিয়েছিলেন। এর পর বিকেল পাঁচটা থেকে হঠাৎই রোগীর অবস্থার অবনতি হয়, রোগীর বাড়ির লোকেরা ওয়ার্ডের চিকিৎসকের চেম্বারে গেলে তিনি নাকি সিগারেট মুখে নিয়ে অন্য ডাক্তারের কাছে পাঠান, সেই ডাক্তার আবার অন্য কোনো ডাক্তারের কাছে। এই ভাবে শাটল ককের মতো ঘুরছেন রোগীর আত্মীয়রা আর রোগীর অবস্থা ক্রমশ সঙ্গীন হচ্ছে।অবশেষে ওই ওয়ার্ডে অন্য এক চিকিৎসকে হাত ধরে টেনে আনে রোগীর পরিবার। ওই চিকিৎসক একটা ইনজেকশন দেন রোগীকে।দশ মিনিটের মধ্যে মারা যান মহ: শাহিদ।

স্বাভাবিক ভাবে মৃত্যুর চার ঘন্টা পরে ডেথ সার্টিফিকেটে ও দেহ পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হবে এটাই নিয়ম। কিন্তু এ ক্ষেত্রে সেই নিয়ম না মেনে দেহ আটকে মৃতের পরিবারের লোকেদের ক্ষমা চাইতে বলেন জুনিয়ার ডাক্তাররা। মৃতের পরিজনেরা জানাচ্ছিলেন যদিও তারা কোনো ডাক্তারকে মারধর বা গালিগালাজ করেননি, শুধু আপৎকালীন চিকিৎসার জন্য একজন ডাক্তারকে হাত ধরে টেনে এনেছিলেন, তবুও দেহ হাতে পাওয়ার জন্য তারা ক্ষমা চাইতে রাজি আছেন।কিন্তু জুনিয়র ডাক্তাররা গোঁ ধরে আছেন কেবল মাত্র দুজন গিয়ে ওই বাড়িতে জমায়েত হওয়া শতাধিক জুনিয়র ডাক্তারের কাছে ক্ষমা চাইতে হবে। মৃতের বাড়ির লোকেরা ভয় পাচ্ছিল যে তাদের মধ্যে যে দুজন ক্ষমা চাইতে যাবে তাদেরকে জুনিয়র ডাক্তাররা হেনস্তা করবে। তাদের প্রস্তাব ছিল পুলিশের উপস্থিতিতে ডাক্তার বাবুরা ওই বিভাগের বন্ধ গেটের সামনে এলে, গেটের বাইরে থেকে তারা ক্ষমা চাইবেন। পুলিশ জুনিয়ার ডাক্তারদের সঙ্গে মধ্যস্থতার চেষ্টা চালাচ্ছিলেন, কিন্তু সফল হচ্ছিলেন না। এর মধ্যে বিক্ষোভকারীদের কয়েকজন UNB বিল্ডিংএর বন্ধ গেটের সামনে বসে পরেন। এই ভাবে ক্ষোভ বিক্ষোভের পালা চলছে, এন্টালি থানার পুলিশ অবস্থা স্বাভাবিক করে মৃতদেহ পরিবারের হাতে তুলে দেবার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। পুকুরের ধারে অন্য রোগীর আত্মীয়রা কেউ ঘুমিয়ে রয়েছেন কেউ বা উৎসুক চোখে ঘটনাটা কোনদিকে মোড় নেয় তা দেখছে।

আমি ওখান থেকে হেঁটে একটু এগিয়ে গেলাম। দেখলাম পেট সিটি স্ক্যান সেন্টারের সামনের যে রাস্তা মর্গের দিকে গ্যাছে, সেখানে কিছু জুনিয়ার ডাক্তারদের জটলা। দেখলাম কয়েকজন মিডিয়া কর্মীও সেই দিকে যাচ্ছে। মিডিয়ার কর্মীদের দেখে ভাবী ডাক্তার বাবুরা জটলা ভেঙে যে যার মতো ছড়িয়ে পড়লো। মিডিয়ার কর্মীরা তাদের ডেকে কথা বলতে চাইলেন। সামনে যে যে জুনিয়র ডাক্তারদের পেলেন তাদেরকেই প্রশ্ন করলেন মৃতের পরিবার কি তাদের হেনস্থা করেছিলেন ,মারধর বা গালিগালাজ করেছিলেন? জুনিয়র ডাক্তার বাবুরা কিন্তু কোনো উত্তর দিলেন না। আমিও জানতে পারলাম না ঠিক কি ধরণের হেনস্তার জন্যে মৃত দেহ আটকে রেখেছেন জুনিয়র ডাক্তার বাবুরা।

যাই হোক আমি আবার আস্তে আস্তে UNB র সামনের জটলার কাছে এলাম।উত্তেজনা বাড়ছে। ঘড়ির কাঁটা পৌনে বারোটার কাছে। মৃতের পরিজনদের বক্তব্য মৃত্যুর ছয় ঘন্টা পরেও কেন তারা দেহ হাতে পাবেন না?

এর পরের ঘটনা খুব দ্রুত ঘটে যায়। যে জুনিয়র ডাক্তাররা পেট সিটি স্ক্যান সেন্টারের কাছে জটলা করে ছিলেন তারা যে কোনো কারণেই হোক এই দিকে আসছিলেন। বিক্ষোভকারীদের সেই দিকে নজর যায়। অনেক বিক্ষোভকারী ধাওয়া করতে যান জুনিয়র ডাক্তার বাবুদের। প্রায় ২৫ মিটার এগিয়েও যায় তারা। কিন্তু পুলিশ ও বিক্ষোভকারীদের মধ্যে থাকা শুভবুদ্ধি সম্পন্ন কয়েকজনের তৎপরতায় আটকে দেওয়া হয় তাদের। জুনিয়র ডাক্তার বাবুদের কোনরকম ক্ষতি করতে পারেনি তারা। ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিলে তারা পিছিয়ে চলে আসেন UNB র বন্ধ গেটের সামনে।

ঘড়ির কাঁটা এগিয়ে রাত এগারোটা পঞ্চাশ। হঠাৎই UNB র বন্ধ দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে আসেন অন্তত শ খানেক জুনিয়র ডাক্তার। ঝাঁপিয়ে পড়েন বিক্ষোভ কারীদের উপর। পিছু হটে বিক্ষোভকারীরা। জুনিয়র ডাক্তাররা ধাওয়া করেন তাদের। সঙ্গে যোগ দেয় পুলিশ,বিক্ষোভকারীদের উপর লাঠি চার্জ শুরু করেন তারা। অন্তত একশ মিটার দূরে মেন গেট। ওদিকে দৌড়াচ্ছে এতক্ষণ যারা বিক্ষোভ দেখাচ্ছিলেন তারা। এমার্জেন্সির সামনের মেন গেটের কাছে অন্যান্য রোগীর আত্মীয়রা তখন প্লাস্টিক পেতে শুয়ে পড়েছিলেন। ওখানে তখন রীতিমত রনক্ষত্র, প্রাণ ভয়ে ঘুম থেকে উঠে যে যেখানে পারছে পালাচ্ছে। এর মধ্যে এক বিক্ষোভকারীকে ধরে মেন গেটের সামনে ফেলে পিটাচ্ছে জনা পাঁচেক জুনিয়র ডাক্তার, পুলিশ টেনে হিঁচড়ে নিয়ে গেল তাকে। ধাওয়া করে ডাক্তার বাবুরা ইতিমধ্যে গেটের বাইরে। ওই দিকে প্রাচীর দিকে পালিয়েছে বিক্ষোভকারীরা। বাইরে থেকে ইট ছোড়ে তারা, মাথায় গুরুতর আঘাত পাওয়া এক ডাক্তার বাবুকে তার সতীর্থরা পাঁজা কোলা করে বাইরে থেকে গেটের ভিতরে ঢোকে, ছুটে নিয়ে যায় ইমার্জেন্সিতে।ঢোকার পরেই বন্ধ হয়ে যায় এমার্জেন্সির গেট। আমার দেখা এই ঘটনা গুলোর ছবি আপনারা গত কয়েকদিন ধরে টিভিতে দেখেছেন।

আমি শুধু সত্যটা তুলে ধরলাম। কে ভুল করেছে অথবা কে ঠিক তার বিচারক আমি নই। আমার অনুরোধ আসুননা চিকিৎসকদের প্রতি সমবেদনা জানাতে এনআরএস এ। এর পর সময় করে একটু কথা বলুননা পুকুরের ধারে দিন রাত কাটানো রোগীর আত্মীয়দের সঙ্গে। একটু খুজলেই পেয়ে যাবেন ওই দিন রাতে নিজের চোখে যারা ঘটনাটা দেখেছেন তাদের। কথা বলুন, যদি আমার বর্ণনার সঙ্গে না মেলে আমাকে তেড়ে খিস্তি মারুন। আর যদি মেলে একটু চিন্তা করুন কাদের দোষে এই ঘটনাটা ঘটলো?

আমি আগেই বলেছি কে ঠিক বা কে ভুল তার বিচারে আমি যাচ্ছি না, শুধু কয়েকটি প্রশ্ন তুলছি।

ওই দিন ঠিক কি ঘটেছিল জুনিয়র ডাক্তারদের সঙ্গে যে তারা ক্ষমা না চাইলে দেহ না ছাড়ার পন করলেন? আমরা কিন্তু এর উত্তর খুঁজছি না। আইন অনুযায়ী দেহ ছেড়ে দিয়ে পুলিশ অভিযোগ করলেন না কেন তারা?

নিয়ম অনুযায়ী মৃত্যুর চার ঘন্টা পরে ডেথ সার্টিফিকেট ও দেহ দেবার কথা তা না করে দেহ আটকে রাখলেন কিছু জুনিয়র ডাক্তার বাবু। রোগীর বাড়ির লোকেদের ক্ষোভ হওয়া কি অস্বাভাবিক?

যদি দেহ ময়নাতদন্তের দরকার ছিলই, তবে তা পুলিশ এবং মৃতের পরিবারকে পরের দিন না জানিয়ে আগেই জানানো হলো না কেন?

সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখলাম মৃত মহ: শাহিদ একজন মৌলবী, এবং তার বয়স ৮৫। শুধু এই দুটি অপরাধের জন্যেই কি তার মৃত্য নিয়ে প্রশ্ন তোলা যাবে না?যেরকম ইঙ্গিত করছেন সোশ্যাল মিডিয়ায় কিছু মানুষ।

আমি বিক্ষোভকারীরা দুটি লরিতে এসেছিলেন কিনা জানিনা, কিন্তু এলাকায় কেউ মারা গেলে অনেক সময়ই বহু মানুষ আসেন। এদেরও অন্তত শ খানেক মানুষ ছিলেন। কিন্তু এরা কেউই বাঁশ বা অস্ত্র নিয়ে আসেননি। এমনকি হাসপাতাল ও একটুও ভাঙচুর করা হয়নি। তবে কেন এই ধরণের মিথ্যা ছড়ানো হচ্ছে?

ঘটনার পনের মিনিটের মধ্যেই হাসপাতালের দুটো গেট ই বন্ধ করে বসে পড়েন জুনিয়র ডাক্তার বাবুরা। MSVP অফিস ছাড়িয়ে, ন্যায্য মূল্য ওষুধের দোকান ছাড়িয়ে কিছুটা এগোলে বাঁ হাতে কিছু বাঁশ রাখা ছিল, সেখান থেকে বাঁশ নিয়ে রীতিমত হাসপাতাল শাসনে নেমে পড়েন কিছু জুনিয়র ডাক্তার বাবু। পরের কয়েক ঘন্টা শুধু গাড়ি না, হাসপাতালে ভর্তি থাকা রোগীর আত্মীয়দের বাইরে বেরোতে দেননি ওই ডাক্তার বাবুরা।তাদের এই অধিকার কে দিলেন?

প্রথমে যে প্রশ্নটা করেছিলাম, এই আন্দোলনে কার লাভ বা কার ক্ষতি??
যারা মমতা ব্যানার্জী এবার পাঁকে পড়েছেন বলে আনন্দে আলহাদিত তাদের কাছে জানতে চাই আপনারও কি আমার মতোই সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে হয়। আমার মতো আপনিও কি পরিবারের কেউ গুরুতর অসুস্থ হলে সরকারি হাসপাতালে ছুটে যান? তা হলে দু বার ভাবুন।বুদ্ধিজীবি, রাজনীতিবিদ, উচ্চবিত্তরা অসুস্থ হলে সরকারী হাসপাতালে না গেলেও চলবে। কিন্তু আপনার বাড়ির কাউকে যদি এই মুহূর্তে হাসপাতলে ভর্তি করতে হয়, তবে কিন্তু আপনাকেও ঘটি বাটি, জমি বিক্রি করতে হতে পারে।আর তাতে লাভের করি গুনবে বে সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবসায়ীরা।

আমার মতো আপনিও সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকদের সম্মান করেন, ভরসা করেন।তাই আসুন না আমরা সব্বাই মিলে তাদের অনুরোধ করি আবার আমাদের মাথার উপর ভরসার ছাতা হয়ে দাঁড়াতে।