নিজস্ব প্রতিনিধি, টিডিএন বাংলা, কলকাতা: লোকসভায় তিন তালাক বিল পাশ হয়ে গেলেও রাজ‍্যসভায় সেই বিল আটকে যায়। কিন্তু সম্প্রতি রাজ‍্যসভাতেও সেই বিল পাশ হয়ে যায়। যেটা মোদি সরকারের বড় সাফল্য মনে করছে জয়েন্ট মুভমেন্ট কমিটি কর্মীরা। বুধবার কলকাতা প্রেস ক্লাবে জয়েন্ট মুভমেন্ট কমিটির ডাকা সাংবাদিক বৈঠকে সুস্মিতা ভট্টাচার্য, সালিমা হালদার, তোজাম্মেল হক, নাজিমা খাতুন, ওসমান মল্লিকরা মুসলিম মেয়েদের বাড়ির অভিভাবক করার অধিকার দেবার দাবি তোলেন। তারা প্রথম থেকেই তিন তালাক বিল আনার পক্ষে ছিলেন। ইসরাত জাহান, কাজী মাসুম আকতার সহ তারা দীর্ঘদিন ধরেই তিন তালাকের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে আসছিলেন। স্বাভাবিক ভাবেই সরকার তিন তালাক বিল আনাতে তারা প্রচণ্ড খুশি।

জয়েন্ট মুভমেন্ট কমিটির অন‍্যতম কর্মী সালিমা হালদার বলেন, মুসলিম মেয়েরা প্রতিনিয়ত আতঙ্কের মধ্য দিয়ে দিন কাটাত। আজ থেকে মুক্তি পেল। তিনি মুসলিমদের তিন তালাক কে অমানবিক নীতি বলেও আখ্যায়িত করেন। তিন তালাক বিল কে সমর্থন জানিয়ে তিনি মোদি সরকারের ভূয়সী প্রসংশা করেন।

এছাড়াও তিনি অভিযোগ করেন, মুসলিমদের মধ‍্যে ব‍্যপক পরিমানে বহুবিবাহ চালু আছে। যার ফলে মেয়েরা পুরুষদের কাছে সবসময় আতঙ্কে থাকে। এটা অমানবিক ও অত্যন্ত যন্ত্রণা দায়ক প্রথা। তিনি আরও জানান, বহুবিবাহের ফলে অনেক সন্তানের জন্ম হয়। যেটা সংসারে জ‍ন‍্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। এছাড়াও সালিমা বলেন, মুসলিম পরিবার গুলিতে মেয়েদের স্বামী মারা গেলে তাকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে শ্বশুর বা শ্বশুরবাড়ির লোকজনেরা বাড়ি থেকে বের করে দেয়। যেটা চরম অন‍্যায়। তাছাড়া মেয়েদের সমান সম্পত্তির ভাগ দিতেও অস্বীকার করে মুসলিম পরিবারগুলি। তিনি তালাক প্রথা বন্ধ হওয়াতে খুশি হলেও বাকি বিষয়গুলি নিয়ে আবার আন্দোলনে নামার হুশিয়ারি দেন।

জয়েন্ট মুভমেন্ট কমিটির কনভেনর পেশায় সরকারী স্কুলের প্রধান শিক্ষক ওসমান মল্লিক বলেন, তালাক নিয়ে আমাদের দীর্ঘদিনের আন্দোলন আজ সফল। এক সময় ইশ্বর চন্দ্র বিদ‍্যাসাগর, রাজা রাম মোহন রায় হিন্দু ধর্মের জঞ্জাল গুলো সাফ করে হিন্দু মহিলাদের মুক্তি দিয়েছিলেন। আমরাও দীর্ঘদিন ধরেই চাইছিলাম তিন তালাক নামক কঠিন ও অমানবিক নিয়ম থেকে মুসলিম মহিলাদের মুক্তি দিতে। আজকে সেই আশা পূরণ হল। তিনি আরও বলেন, কথায় কথায় মেয়েদের মারধর করে ঘরথেকে বের করে তালাক দেওয়া হয়। এরম জ্বালাতন থেকে মুক্তি পেল মুসলিম মহিলারা। এছাড়াও ভারতে সমস্ত ধর্মের মানুষ আদালের নিয়ম অনুযায়ী বিবাহ বিচ্ছেদ করে শুধু মাত্র মুসলিমরা ছাড়া।

এদিন, ওসমান তিন তালাক বিলকে মোদি সরকারের বড় সাফল্য বলে মনে করছেন। তিনি আগামী দিনে মুসলিম দের বহু বিবাহ বন্ধ ও মুসলিম মহিলাদের বিভিন্ন বঞ্চনা থেকে মুক্তি পাই তার জন্য আন্দোলনের নামারও ইঙ্গিত দেন।

এদিন সাংবাদিক বৈঠকে জয়েন্ট মুভমেন্ট কমিটির সম্পাদক তোজাম্মেল হক জানান, তিন তালাক নিয়ে ২০১০ সালে জয়েন্ট মুভমেন্ট কমিটি প্রথম আন্দোলন শুরু করে। ২০১৭ সালে আমরা সেই আন্দোলনকে জোরদার জায়গায় নিয়ে যায়। ভারতে প্রায় ১০ কোটি মুসলিম মহিলা তালাক নিয়ে প্রতিনিয়ত আতঙ্কে দিন কাটায়। সেই কারণে মুসলিম মহিলাদের সঠিক বিচার পাইয়ে দিতে আমরা রাষ্ট্রপতি ও সুপ্রিম কোর্টের দারস্থ হয়।

আন্দোলনের অন‍্যতম সদস‍্য ডা. সুস্মিতা ভট্টাচার্য এবিষয়ে বলেন, এতোদিন ধরে সংগ্ৰাম করে আজ যেটা হল তাতে আমরা খুব খুশি। আজকের দিনটা আমাদের কাছে আনন্দের দিন। সিরিয়া জর্ডানে তিন তালাক নেই কিন্তু ওখানে শাস্তি হিসেবে পা কাটা, হাত কাটার নিয়োম আছে। তার চাইতে একা অনেক ভালো হল। সবচেয়ে ঘৃণ্য কাজ তিন তালাক বন্ধ হয়েছে। এটা থেকে মুসলিম মেয়েরা মুক্তি পেল।

ওই আন্দোলনের অন‍্য কর্মী ও সমাজ সংস্কারক নাজিমা খাতুন বলেন, তালাক তালাক তালাক মুখে বললেই মুসলিমদের বিবাহ বিচ্ছেদ হয়ে যায়। সেটা বন্ধ হয়েছে আমি খুব খুশি। এছাড়াও তিনি জানান, ছেলে মেয়ে এক পরিবারের জন্ম গ্ৰহণ করলেও মুসলিম পরিবারে মেয়েদের কে সমান সম্পত্তি ভাগ দেওয়া হয়না। সরকার যদি এব‍্যাপারে ব‍্যবস্থা নেয় তো ভালো। নয়লে আমরা আবার সুপ্রিম কোর্টে যাব মেয়েদের সমস্ত অধিকার পাইয়ে দিতে।

আন্দোলনের আরও এক কর্মী ডা.শেখ হাসিনা এদিন বলেন, একটি দেশে একটি আইন থাকবে। বিবাহ বিচ্ছেদের জন্য একই দেশে হিন্দু-মুসলিমদের জন্য আলাদা আলাদা আইন থাকবে কেন? তিনি নিজের জীবনের ঘটনা উল্লেখ করে বলেন, আমাকে আমার স্বামী তালাক দিয়েছেন। কিন্তু কবে কিভাবে তিন তালাক দিয়েছেন তা আমি নিজেও জানিনা। তাই আমি বললো এমন ঘৃণ‍্য প্রথা সরকার বন্ধ করা সঠিক সিদ্ধান্ত।

তবে সংখ্যালঘু যুব ফেডারেশনের রাজ‍্য সম্পাদক মহম্মদ কামরুজ্জামান তিন তালাক বিলের তীব্র প্রতিবাদ ও মোদি সরকারের বিরোধিতা করে বলেন, মোদি সরকার মুসলিমদের যেনতেন প্রকারে হেনস্থা করার জন্য তিন তালাক বিল আনল। একটা সার্বোভৌমত্ব ও ধর্মীয় নিরপেক্ষতা দেশে ধর্মীয় নিয়মের উপর হাত দিয়ে মোদি সরকার বুঝিয়ে দিল যে, ফ‍্যাসিবাদ শক্তির দ্বারা দেশ পরিচালনা হচ্ছে। মোদি সরকার যৌন পল্লীতে হাজার হাজার মহিলা রয়েছে তাদের কে উদ্বার না করে তালাক নিয়মের উপর হাত লাগাল। এবিষয়ে সরকারের বিরুদ্ধে তিনি মুসলিম পার্সোনাল ল বোর্ডের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আন্দোলনে নামারও হুশিয়ারি দেন।