অপর্ণা দাস, টিডিএন বাংলা, হাওড়া: পঞ্চমীতে ক্লাস হয়ে স্কুল-কলেজগুলিতে দুর্গাপুজোর ছুটি পড়লো। ছুটির আমেজে মেতে উঠলো পড়ুয়ারা৷ স্কুলে ছুটির ঘন্টা পড়া মাত্রই এক ছুটে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেয় ক্ষুদে পড়ুয়ারা। হাওড়ার খানপুর জুনিয়ার বেসিক স্কুলেও একই ছবি। কিন্তু তারমধ্যে কোথাও যেন একটা বিষাদের সুর। দিন কয়েকের জন্য স্কুল, স্কুলের গাছপালা আর অন্য সকলকে ছেড়ে যেতে যেন মন কেঁদে উঠল ছাত্রছাত্রী থেকে শুরু করে শিক্ষকদের।

খানপুর জুনিয়ার বেসিক স্কুলে পড়ুয়ার সংখ্যা ১৫৮। শিক্ষক ছ’জন। স্কুলের বয়স সাতান্ন বছর। গ্রামীণ হাওড়ার তুলসীবেড়িয়া বাসস্ট্যান্ড থেকে দশ মিনিট হাঁটলেই রাস্তার ধারে স্কুলটি। পাঁচটি শ্রেণিকক্ষ। ছ’টি বাথরুম। স্কুলের চারপাশ প্রাচীর দিয়ে ঘেরা। স্কুলের সামনে বড় খেলার মাঠ। এ দিন ছুটির পর স্কুলের গেট পার হতেই দে দৌড় পড়ুয়ারা। চোখে মুখে খুশির ঝিলিক ও মনে ফুরফুরে মেজাজ সকলেরই।
সবার মুখে একই গল্প। প্রতিম, অনীমা, শুভাশিষ, দিগন্ত, নীলিমা, অবিনাশ, প্রাপ্তিক, তমসা, অদ্রিজা, সৃজা প্রত্যেকের কথায় জামার হিসাব। প্রতিদিন নতুন জামা পড়ে দুর্গা ঠাকুর দেখতে যাব। বন্ধুরা মিলে বাড়ির কাছাকাছি ঠাকুর দেখতে যাব। ক্যাপ ফটানো বন্দুক কিনেছি। বেলুন ফুলিয়ে ওড়াব। খুব খুব আনন্দ করবো। তবে এসবের মধ্যেও স্কুলের প্রতি দায়িত্ব পালনের কথা কিন্তু ওরা ভোলেনি। তাই ওদের মুখে একথাও শোনা যে, আজ ছুটির সময় স্কুলের গাছে জল দিয়ে এসেছি। ছুটির পর স্কুল খুললে আবার আসবো।

স্কুলের সহশিক্ষক মহম্মদ নইমুদ্দিন খান জানান, “দুর্গাপুজো আসলে ছাত্রছাত্রীদের মন পড়ায় বসে না। মনে ঘুরপাক খায় পুজোয় কি পড়বে, কোথায় ঘুরতে যাবে। কতগুলো ঠাকুর দেখবে। ওরা এখন শিশু। পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলা এবং সম্প্রীতির মেলবন্ধন যত ফুটে উঠবে, তত বিকাশ হবে মনের। স্কুলের প্রধান শিক্ষক সেখ জাহাঙ্গীর আলী ছাত্রছাত্রীদের শিক্ষার পাশাপাশি একজন ভালো মানুষ হবার কথা বোঝান। তিনি আরও বলেন, বিদ্যালয়টিতে রয়েছে নিজস্ব সবজি ও ফুলের বাগান। বাগানের বিভিন্ন রকম সবজি যেমন পালং শাক, বেগুন, টমেটো, লঙ্কা ইত্যাদি চাষ হয়। শরৎ শেষ হলেই শুরু হবে নতুন করে চাষ করা।

স্কুলের অন্যান্য শিক্ষকদের কথায়, “এই স্কুল অন্যান্য স্কুলের থেকে আলাদা। পড়াশোনার পাশাপাশি ছাত্রছাত্রীদের বুদ্ধিমত্তার জন্য চিন্তাভাবনা করা হয়। স্কুলে প্লাস্টিক বর্জন করার জন্য প্লাস্টিকের পুণরায় ব্যবহার কীভাবে করা যায় সেটা নিয়ে বিভিন্ন রকম মডেল স্কুলে বর্তমান রয়েছে। প্লাস্টিকের বোতলে বৃক্ষরোপণ করে বিদ্যালয়ের বেশিরভাগ অংশ সবুজানা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের পড়ার জন্য লাইব্রেরি বইয়ের ব্যবস্থা রয়েছে।”

বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সমস্ত কাজকর্ম দেখার জন্য রয়েছে বাচ্চাদের নিয়ে তৈরি স্টুডেন্ট কেবিনেট। সাতজন মন্ত্রী নিয়ে তৈরি। শিক্ষামন্ত্রী, স্বাস্থ্যমন্ত্রী, খাদ্যমন্ত্রী, পরিবেশ মন্ত্রী, সংস্কৃতিমন্ত্রী, যোগাযোগ মন্ত্রী এবং ক্রীড়া মন্ত্রী। প্রতিমাসে মন্ত্রিসভার বৈঠক হয় এবং নির্দিষ্ট একটি বিষয়ের উপরে আলোচনা করা হয়। কিন্তু ছুটি ক’টাদিন ওদের কথা ভেবেই মনটা খুব খারাপ হয়ে যাচ্ছে। একথা জানান শিক্ষকরা।

তাদের কথায়, প্রকৃত সন্তান তো ওরাই। শিক্ষক হলেও ওদের প্রতি দায়দায়িত্ব বেশি যে শিক্ষকদের। কে পড়াশোনায় মনযোগ কম, কেন মিড ডে মিল খাচ্ছে না, সুস্থ কতটা, গল্পের ছলে আড্ডা দেওয়া সবটাই তো ওদের নিয়ে। খারাপ তো লাগছে ক’টা দিন দূরে থাকতে হবে এই ভেবে।’ পুজোর ছুটির আনন্দের মধ্যেও শিক্ষক-ছাত্রদের এ এক বিচ্ছেদের সুর। তবুও বাজল ছুটির ঘন্টা।