রশিদা খাতুনের বাড়ি বীরভূমের মাড়গ্রাম থানার বাগানপাড়ায়। তিন বোন, এক ভাই। ছোটতেই মারা গিয়েছেন মা। বাবা সবজি বিক্রি করে সংসার চালান। বড়বোনের বিয়ে হয়েছে। বাড়িতে দুই বোন অন্ধ। ভাই বিয়ে করে আলাদা সংসার পেতেছেন। বাড়ির ছোট রশিদা। ছোট থেকেই পড়াশোনার প্রতি প্রবল আগ্রহ। গ্রামের স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে ভর্তি হয় মাড়গ্রাম হাই মাদ্রাসায়। নিয়মিত স্কুলে গিয়ে মন দিয়ে শিক্ষকদের পড়ানো মনোযোগ দিয়ে শুনত। সময় পেলেই সহপাঠীদের ডেকে বিভিন্ন বিষয় পাঠ করিয়ে শুনে শুনে নিজেকে মেধাবী তৈরি করে ফেলে। তাই ক্লাসে গিয়ে যে কোনও প্রশ্নের উত্তর দিয়ে ফেলত অতি সহজেই। জটিল অঙ্কের উত্তর মুখে মুখে সহজ করে বলে দিত পারত শিক্ষকদের। তাই ক্লাস পরীক্ষা না দিয়েই তাঁকে দশম ক্লাস পর্যন্ত পৌছে দিয়েছিলেন শিক্ষকরাই। এবার তাঁর মাধ্যমিকে বসার কথা ছিল। সেইমতো প্রস্তুতিও নিচ্ছিল। শিক্ষকদের কাছে রাইটার চেয়ে আর্জি জানিয়েছিল। কিন্তু অভিযোগ, একজনও রাইটার যোগার করে দেননি শিক্ষকরা। বরং রশিদাকেই রাইটার খোঁজার দায়িত্ব দিয়ে দায় সেরেছিলেন প্রধান শিক্ষক।

যার সক্রিয় সহযোগিতার অভাবে এ বছর মাধ্যমিকে বসা হল না রশিদার, সেই প্রধান শিক্ষক গোলাম মহম্মদ সাফাই দেন, ‘আমি রাইটার যোগার করার চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু নবম শ্রেণীর কোনও ছাত্রছাত্রী ওর হয়ে পরীক্ষায় বসতে রাজি হয়নি। ছাত্রীর বাবাকে ডেকে রাইটার যোগার করার জন্যও বলেছিলাম। কিন্তু তারা আর যোগাযোগ করেননি। ফলে এখানে আমার কী করার আছে। আমি তো আর ওর হয়ে পরীক্ষায় বসব না।’ রশিদা বলে,  ‘আমি দীর্ঘদিন আগেই রাইটারের জন্য বলেছিলাম। সে সময় বলা হয়েছিল, পরীক্ষার আগে আবেদন করতে। সেইমতো নির্দ্দিষ্ট সময়েই আবেদন করেছিলাম। শেষমুহূর্তে প্রধান শিক্ষক আমাদের চিঠি দিয়ে নিজেকে রাইটার যোগার করার কথা বলেছেন। কিন্তু আমার ডাকে কেউ সাড়া দেয়নি।’ পরীক্ষা দিতে না পেরে সকাল-সন্ধে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ছে মেয়ে। আর বলছে, ‘আমার একটি বছর নষ্ট হয়ে গেল।’ বাবা নাসির মোমিন বলেন, ‘আমি কানে কম শুনতে পাই। পেটের ভাত যোগার করতে সকাল বেড়িয়ে যায়। ফলে কোন ছেলেমেয়ে যোগার করতে পারিনি পরীক্ষায় বসে মেয়ের মুখের কথা শুনে লিখে দেওয়ার জন্য। শিক্ষকদের কাছে অনুরোধ করেছিলাম। কিন্তু স্কুলের তরফে তেমন কোন সাহায্য পাইনি।’

মহকুমা শাসক সুপ্রিয় দাস বলেন, ‘এই ঘটনা স্কুল কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত গাফিলতি। তাদের আরও মানবিক হওয়া উচিত ছিল। কারণ, সবসময় ছাত্রছাত্রীদের পাশে থাকেন শিক্ষকরা। এক্ষেত্রেও পাশ থাকা উচিত ছিল। কেন বিষয়টি তারা হালকা ভাবে নিলেন, তারাই বলতে পারবেন। তবে সামনে মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা। স্কুলের গাফিলতিতে পরীক্ষায় বসতে পারছে না, এমন অভিযোগ পেলে আমরা সেই ছাত্রছাত্রীদের সাহায্য করব।’জন্ম থেকেই দু’টি চোখ নষ্ট। মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরতে আরও একটা বছর নষ্ট হলেও জীবনটা হেলায় নষ্ট হতে দিতে রাজি নয় রশিদা। তাই আগামী বছর নিজেই ‘রাইটার’ যোগার করে মাধ্যমিকে বসার প্রতিজ্ঞা নিয়েছে রশিদা। তার বিশ্বাস, শিক্ষাজীবনের প্রথম বড় গণ্ডিটিও সাফল্যের সঙ্গে টপকে যাবে সে। (দিন দর্পন)