টিডিএন বাংলা ডেস্ক : আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়৷ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ঐতিহ্যবাহী আলিয়া মাদ্রাসাকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত করা হয়। পশ্চিমবাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপােধ্যায় আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকাঠামো নির্মাণ ও অন্যান্য ক্ষেত্রে দরাজদিলভাবে অনুমোদনের ব্যবস্থা করেছিলেন৷ হিন্দু মুসলিম ছাত্র ছাত্রী ও শিক্ষক-শিক্ষিকার সমন্বয়ে আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয় দেশের এক প্রথম অেণির প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃতি অর্জ্যনর সমূহ সম্ভাবনা ছিল৷ এছাড়া মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দিক নির্দেশনায় পিছিয়েপড়া মুসলিম সমাজের উন্নয়নে এই বিশ্ববিদ্যালয়টি এক বিশেষ ভূমিকা পালন করতেও শুরু করেছিল। এমনকি এই বিশ্ববিদ্যালয় সাম্প্রতিক অতীতে সংখ্যালঘুদের স্বনির্ভর করার লক্ষ্যে ভোকেশনাল ট্রেনিং কোর্সেরও ব্যবস্থা করেছিল। প্রাক্তন উপাচার্য ড.আবু তালেব খান এই বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকাঠামাে নির্মাণসহ বিএসসি নাসিং, অইিনবিভাগ, বিএড, সায়েন্স ও ইঞ্জিনিয়ারিং প্রভৃতি চালুকরার পর মেডিকেল কলেজ গড়ারও উদ্যোগ নিয়েছিলেন৷ এছাড়া অলইন্ডিয়া কাউন্সিল ফর টেকনিক্যাল এডুকেশনেরও স্বীকৃতি ছিল আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইঞ্জিনিয়ারিং কাের্সগুলির। পরে তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনাগ্রহের ফলে বাতিল হয়ে যায় বলে অভিযোগ। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপােধ্যায়ের স্বপ্ন হচ্ছে আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়কে বিশ্বমানের ইনস্টিটিউশন ও পশ্চিমবাংলার গর্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে।

কিস্তু ইদানিং দেখা যাচ্ছে, সংখ্যালঘু উন্নয়নের জন্য যে সব উদ্যোগ আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে হচ্ছিল, আলিয়ার বর্তমান কর্তৃপক্ষ তার সহযোগী হতে রাজি নন৷ তার সাম্প্রতিক একটি নজির তুলে ধরা হচ্ছে। পশ্চিমবাংলার প্রখ্যাত শিক্ষা, গবেষণা, উন্নয়ন ও নাগরিক সংগঠন ‘সন্যাপ একাডেমি’ গত দু’বছর ধরে মূলত সংখ্যালঘু ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে উন্নত মানের এক ডাব্লুবিসিএস ট্রেনিং কোর্স পরিচালনা করছিল। এই জন্য আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্কমার্কাস ক্যাম্পাসে দুটি ঘর ছুটির দিন শনিবার ও রবিবার তারা ব্যবহার করত। আর এ জন্য আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসি-র বৈঠকে তা পাশ করিয়ে সাগ্রহে অনুমতিও দিয়েছিল৷ মূলত গ্ৰামগঞ্জের দরিদ্র ছেলেমেয়েরা খুবই অল্প খরচে এখানে ডব্লুবিসিএসের জন্য তৈরি হওয়ার সুযোগ পাচ্ছিল। অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে যেখানে কোর্স ফি ৫৫ থেকে ৮০ হাজার টাকা সেখানে স্ন‍্যাপ একাডেমি মাত্র ১২ হাজার টাকায় ছাত্রছাত্রীদের এই কোর্স করার সুযোগ দিচ্ছে। অনেক সমযয়ে দরিদ্র ছেলেমেয়েরা তাও দিতে না পারলেও সন্যাপ একাডেমি তাদের পড়াশুনায় ছেদটানেনি৷ কিন্ত আজ যখন স্ন‍্যাপের পরীক্ষার্থীরা ভর্তি পরীক্ষার ইন্টারভিউ দিতে নিয়মমতো আলিয়ার পার্কসার্কাস ক্যাস্পসে হাজির হন-আলিয়া কর্তৃপক্ষের নির্দেশে তাদের সেখানে প্রবেশ করতে দেয়নি নিরাপত্তারক্ষীরা ৷ ফাল দূরদূরান্তের ছাত্রছাত্রীরা নিরাশ হয়ে ফিরে যেতে বাধ্য হন ৷ কয়েকদিন আগে হঠাৎই আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান কর্তৃপক্ষ স্নাপের উদ্যোক্তাদের ডেকে ফরমান জারি করে দেন-এই ধরনের কাের্সের জন্য ছুটির দিনে হলেও আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসরুম ব্যবহার করা যাবে না। কোর্স শুরুর মুখে এই ধরনের সিদ্ধান্তে স্ন‍্যাপ একাডেমি অসহায় হয়ে পড়ে৷ এরপর নবান্নে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যেগোযোগ করার পর আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. মুহাম্মদ আলি ও রেজিষ্টার নারসাদ আলির সঙ্গে দেখা করেন স্নাপের প্রতিনিধিরা। তারা পুবের কলমকে জানিয়েছেন, রেজিষ্টার জনাব নূরসাদ আলি তাদের বলেন, আপনারা কেন আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে এই ধরনের অনুরোধ করছেন? যাদবপুর বা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কি এই ধরনের অনুরোধ মেনে রেজা খুলে দবে? প্রতিনিধিরা রেজিষ্টারকে বলেন, আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা লঘু চরিত্র সস্পন্ন একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান৷ যাদবপুর কিংবা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে আলিয়ার পাথক্য রয়েছে। তবে, সংখ্যালঘুদের উন্নয়নের স্বার্থে যাদবপুর বা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে ছুটির দিনে একটি বা দুটি ক্লাসরুমের জন্য আবেদন করলে তারা রাজি হবে, না প্রত্যাখান করবে -তা এখনই বলা যাচ্ছে না। কিন্তু মাত্র দিন কয়েক আগে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় সন্যাপের অনুরোধ “নো ইউর নেবর’ বা প্রতিবেশিকে জানুন শীর্ষক এক প্রোগ্রামের জন্য স্ন‍্যাপকে অর্থয়ান করেছে৷

শেষ পর্যন্ত আলিয়ার উপাচার্য মাত্র এক বছরের জন্য স্ন‍্যাপকে ডব্লুউবিসিএস কােচিং করার অনুমতি দিতে রাজি হন। তবে এক্ষেত্রে প্রতিনিধিদের সামনেই রেজিষ্টার নূরসাদ আলি নাকি উপাচার্যকে বলেন স্যার কেন অনুমতি দিচ্ছেন। কেন এসব ফালতু ঝামেলায় আলিয়াকে জড়াচ্ছেন৷ তবে এখানেই শেষ নয়। এরপর স্ন‍্যাপের পরিচালকরা রেজিষ্টার জনাব নূরসাদ আলি সাহেবের কাছ থেকে একটি পত্রাঘাত পান। তাতে রেজিষ্টার সাহেব বলে দিয়েছে যে, এক বছরের সময়সীমা ভবিষ্যতে আর বাড়ানো হবে না। এছাড়া এই এক বছরের জন্যও মুফতে আলিয়ার ক্লাসরুম স্ন‍্যাপকে দেওয়া হবে না। এর জন্য প্ৰতি মাসে স্ন‍্যাপকে ২ হাজার করে ৪ হাজার কড়ি গুণতে হবে।

তবে নবান্নের কর্তৃপক্ষ স্ন‍্যাপকে বলেছে, সংখ্যালঘুদের এই ধরনের একটি ভালো উদ্যোগের জন্য মাসে মাত্র ৪ হাজার টাকা আয় করে বিশ্ববিদ্যালয় কতটা লাভবান হবে। সরকার তো বিশ্ববিদ্যালয়কে বিভিন্ন প্রকল্পে কোটি কোটি টাকা প্রদান করে যাচ্ছে। রোববার ছিল স্নাপ একাডেমির প্রার্থী বাছাইয়ের ইন্টারভিউয়ের দিন কলকাতাসহ বিভিন্ন জেলা থেকে প্রায় ৪০ জন প্রার্থী ভর্তি পরীক্ষা দিতে উপস্থিত হয়। কিন্ত পূর্বনির্দেশ অনুযায়ী সিকিউরিটি গার্ড স্ন‍্যাপের পরীক্ষার্থী ও ইন্টারভিউ নিতে আসা ফ্যাকাল্টিদের কাউকে প্রবেশ করতে দেয়নি। তাদের বক্তব্য, ‘উপরের’ নির্দেশেই এই ব্যবস্থা নিয়েছেন। স্ন‍্যাপের এক প্রতিনিধি পুবের কলমকে বলেন, তারা ১টা পর্যন্ত অপেক্ষা করে চলে যান৷ জেলা থেকে আসা ছাত্রছাত্রী হয়রানির মুখে পড়ে। এবং অবৈতনিক শিক্ষকরা অপমানিতবােধ করেন। এদের বেশিরভাগই প্রাক্তন ও বর্তমান আইএএস বা ডাব্লুবিসিএস অফিসার। এ সম্পর্কে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিষ্টার নুরসাদ আলি পুবের কলমকে বলেন, ‘স্ন‍্যাপের লােকজন অনুমতি না নিয়ে আলিয়ার পার্কসার্কাস ক্যাম্পাসে ঢুকতে চেয়েছিল। তাই তাদের নিরাপত্তারক্ষীরা বাধা দিয়েছে। স্ন‍্যাপের কাছে যে টাকা চাওয়া হয়েছিল তাও তারা দেয়নি৷ কোনও সংস্থাকেই আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছুই ব্যবহার করতে দেব না। স্ন‍্যাপের কোনও অনুমতি ছিলোনা তবুও তারা ক্লাস করছিল। তবে এবার আমরা এক বছরের জন্য অনুমতি দিয়েছি। কিন্তু সেটা হবে পেমেন্টের ভিত্তিতে। তবে টাকা দিয়ে কেউ মুখে ভাত অনুষ্ঠান কিংবা বিয়ে বাড়ির অনুষ্ঠান করতে চাইবে তা আমরা হতে দেব না। স্ন‍্যাপ চাইলে তাদের কােচিং বলকাতা, যাদবপুর বা প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ে করুক। আরও বিভিন্ন সংস্থা আমাদের কাছে অনুরোধ জানাচ্ছে। এখন মুসলিম দরদীদের তো অভাব নেই। মুসলিম দরদে তো অনেকের চোখে ঘুম নেই! তারা করুক না। রোববার আলিয়ার পার্কসার্কস ক্যাম্পাসে স্নাতকোত্তরের প্রবেশিকা পরীক্ষা ছিল৷ তাই স্ন‍্যাপকে কিভাবে অনুমতি দেব? এরপরে হিন্দুরাওতো অ্যাপ্রোচ করবে। তখন তাদেরকে কী বলব? আলিয়া কি শুধু মুসলমানদের জন্য? তা হলে তো সাম্প্রদায়িকতা বাড়বে।’

তবে পর্যালোকরা বলছেন, বহুতল পার্কসার্কস ক্যাম্পাসে ঘরের অভাব নেই। কোনও ফ্লোরের একপাশে দুটো ক্লাসরুম বরাদ্দ করলে মহাভারত অশুদ্ধ হত না। আর স্নাপের পরীক্ষাও বানচাল হত না।

(সৌজন্যে- পুবের কলম)
ছবি-প্রতীকী