টিডিএন বাংলা ডেস্কঃ বিশ্বের সৰ্বোচ্চ চুড়ায় তার আগেও বহু অভিযাত্ৰী গিয়েছেন। কিন্তু বাঙালি মুসলিম সমাজের প্রতিনিধি হিসেবে তিনিই প্ৰথম ।এভারেস্ট শৃঙ্গ জয় করে ইছাপুরের জেলেপাড়ার পর্বতারোহী শেখ সাহাবুদ্দিন আজ, বৃহস্পতিবার বিকালে কলকাতায় ফিরছেন ।

তিনিই বাংলার প্ৰথম মুসলিম পৰ্বতারোহী যিনি এভারেস্ট শৃঙ্গ জয় করলেন। যতদূর জানা গিয়েছে, দেশের প্রথম মুসলিম হিসাবে সাহাবুদিন এই কৃতিত্ব গড়লেন। তার সঙ্গী কুন্তল কাঁড়ার অবশ্য এখন কাঠমাণ্ডুর হাসপাতালে রয়েছেন। তিনিও সাহাবুদ্দিনের সঙ্গেই গত রবিবার এভারেস্ট জয় করেন।তুষার ঝড়ের কবলে পড়ে কুন্তলের ডান হাতের দুটি আঙুল , তুষার ক্ষতে আক্ৰান্ত হয়। এখন তিনি ভালো রয়েছেন।

এভারেস্ট শৃঙ্গ জয়ের আগে খারাপ আবহাওয়ার জন্য ২৫ হাজার ফুট উচ্চতায় তিনদিন বসে থাকতে হয়েছিল তাদের। পর্বতারোহীদের কাছে যা সাক্ষাৎ মৃত্যু-উপত্যকা। দুর্যোগ আবহাওয়ায় নেমে আসাও
সম্ভব নয়। আবার তুষার ঝড়ে ও মৃত্যুও হতে পারে। সেই মৃত্যুর হাতছানির মধ্যে থেকে বেরিয়ে এসে এভারেস্ট শৃঙ্গে জাতীয় পতাকা ।
ওড়ালেন সাহাবুদ্দিন , কুন্তলরা।

এভারেস্ট শৃঙ্গ জয়ের পরে চেষ্টা করেও এই দুই অভিযাত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছিলেন না কেউ । অবশেষে একদিন পরে যখন স্ত্ৰী রুকসোনা এবং ভাই শেখ নিজামুদিন যখন সাহাবুদিনের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন ।

তখন সাহাবুদ্দিনের চোখ দিয়ে করে
পড়ছে আনান্দশ্রু। স্বপ্ন সফল করতে পারার, এভারেস্টেট তেরঙা পতাকা ওড়ানোর আনন্দ সব আনান্দশ্রু হয়ে ঝড়ে পড়ছিল। সেই কথা বলতে গিয়ে এখনও সমান উত্তেজিত স্ত্ৰী রুকসোনা, ভাই নিজামুদ্দিন এবং দিদা হাসিনা খাতুন।

৩৮ বছরের শেখ সাহাবুদ্দিন ছোট বেলা থেকেই একটু অন্যধরনের স্পোর্টসের প্রতি
আগ্রহী। তিন ভাই, এক বোনের পরিবারে দিদিই সবচেয়ে বড়, আর ভাইদের মধ্যে সাহাবুদ্দিন সবার বড়। তাইকোন্ডোতে ব্ল্যাক বেল্টের অধিকারী এবং সাঁতারে পারদর্শী সাহাবুদ্দিন পড়াশুনো ইছাপুরের নবাবগঞ্জ হাইস্কুলে। বাবা শেখ নিজামুদ্দিন চাকরি করতেন ইছাপুরের মেটাল ফ্যাক্টরিতে। বাবার অকাল প্রয়াণের পরে ১৮ বছরেই সেখানে চাকরিতে যোগ দেন সাহাবুদ্দিন। নিজের কৰ্মস্থলেই ‘মেটাল লিটল ফ্যাক্টরি মাউন্টেনিয়ারিং’ ক্লাবের মাধ্যমে পৰ্বতারোহনের হাতেখড়ি হয় সাহাবুদিনের। চাকরি করে পরিবারের প্রতি দায়িত্ব পালন করার সঙ্গে টেকিং-পৰ্বতারোহন সমানতালে চলতে থাকে সাহাবুদ্দিনের । তার ভাই নিজামুদ্দিন বলেন, “দাদার এই কৃতিত্বে আমাদের গর্বের শেষ নেই। সম্ভবত দেশের প্রথম মুসলিম পৰ্বতারোহি হিসাবে এভারেসট জয় করল দাদা। ছোটবেলা থেকেই যা বলত, সেটা সফল করার জন্য মন প্রাণ লাগিয়ে দিত। দাদা বছরে অন্তত দুটো করে এক্সপিডিশন করে । এখনও পৰ্যন্ত ২০-টি এক্সপিডিশন করেছে ও । সম্প্ৰতি লে লাদখে টেকিং এবং হিমাচল প্রদেশের পিন পার্বতি শৃঙ্গে সফল অভিযান করেছে দাদা। আগামী দিনে ধৌলাগিরি শৃঙ্গ অভিযানে যাওয়ারও পরিকল্পনা রয়েছে সাহাবুদ্দিনের ।

পাশাপাশি স্বামীর এভারেস্ট জয় নিয়ে কথা বলতে গিয়ে সমান উত্তেজিত সাহাবুদ্দিনের স্ত্ৰী রুকসোনা । তিনি বলেন, এভারেস্ট শৃঙ্গ জয়ের পরে ওঁর সঙ্গে কথা বলা সম্ভবহয়নি। তখন পরিবারের সবাই খুব উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিলাম । একদিনপরে যখন যোগাযোগ করা সম্ভব হয়, তখন সাফল্যের কথা বলতে গিয়ে উনি কেঁদে ফেলেছিলেন। আমাদেরও একই অবস্থা হয়েছিল।” প্ৰথম যখন এভারেস্ট অভিযানের কথা স্ত্ৰীকে বলেন সাহাবুদ্দিন, সেই দিনের স্মৃতি হাতড়ে রুকসোনা বলেন, “আমি তাঁকে সবসময়ই উৎসাহ দিয়েছি। ও যখন প্ৰথম এভারেস্ট যাওয়ার কথা বলল, তখন আমি বলেছিলাম, তুমি নিশ্চয়ই সফল হবে । ওঁর সাফল্য আমরা কতটা খুশি, তা মুখে বলে বোঝানো সম্ভব নয়। সবাই ওর বাড়ি ফেরার অপেক্ষায় রয়েছি। পুরো রাজ্য ও দেশ গর্বিত করেছেন সাহাবুদ্দিন ‘। ছেলের বয়স মাত্ৰ দুই। কিন্তু সেও বাবার মতো এখন থেকেই সিড়ি দিয়ে যেভাবে ওঠানামা করে তাতে তাকেও ভবিষ্যতের এভারেস্ট অভিযাত্ৰী ভাবতে শুরু করেছেন পরিবারের সদস্যরা।
আনন্দে উদ্বেলিত সাহাবুদ্দিনের দিদা হাসিনা খাতুনও । নাতি কখন বাড়ি ফিরবে তার আশায় উত্তেজিত দিদাও । তিনি বলছেন, “ছোটবেলা থেকে পাহাড়ে চড়া ওঁর কাছে নেশার মত ।বৃহস্পতিবার ও ফিরছে। ওকে দেখার জন্য তর
সইছে না।” দমদম বিমানবন্দরে তাকে স্বাগত জানাতে পরিবারের সদস্যরা ছাড়াও থাকছেন অফিসের অফিসাররা। এভারেস্টট হাতছানি দেয় বারবার। বিশ্বের সৰ্বোচ্চ চুড়ায় উঠেছেন অনেকেই। কাজেই সেটা নতুন নয়। কিন্তু এভারেস্ট লক্ষ্যমাত্ৰাটই ক’জন রাখতে পারেন।সেই লক্ষ্য পূরণ করে যিনি ফিরতে পারেন তিনিই তো প্ৰকৃত বীর ।