মিজানুর রহমান, টিডিএন বাংলা, বসিরহাট : মাস তিনেক আগে উত্তর ২৪ পরগনার কাটিয়াহাট দক্ষিণ পাড়ার বাসিন্দা সফিকুল ইসলাম গাজী পুত্র শরিফুল গাজীকে নবম শ্রেনীতে ভর্তি করান পূর্ব মেদিনীপুরের শ্রীরামপুর এগ্রিকালচার হাইস্কুলে নামক একটি আবাসিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। পরিবারের দাবী-“আমরা মুসলিম সম্প্রদায়ের হওয়ায় মিশন কর্তৃপক্ষ আমার ছেলেকে ভর্তি নেবেনা বলে বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু ওখানকার কিছু মানুষের চাপে শেষমেষ ছেলেকে ভর্তি নেয়। কিন্তু এভাবে ভর্তি নেওয়ার পরেও যে ওরা আমার ছেলেকে মেরে ফেলবে সেটা ভাবতে পারছি না।”

মৃত সরিফুলের মা বলেন -“দুদিন আগেই ছেলে বাড়িতে ফোন করে জানিয়েছে যে, পরীক্ষা চলছে শেষ হলেই বন্ধুদের নিয়ে বাড়িতে ঘুরতে আসবে। এর মধ্যেই ছেলে আমার আত্মহত্যা করে কিভাবে? এটা একটা পরিকল্পিত খুন, আমার ছেলেকে পরিকল্পিত ভাবেই ওরা হত্যা করেছে।”

অভিযোগের তীর স্কুলের প্রধান শিক্ষক ও হোস্টেলের সুপারের বিরুদ্ধে। “আমার ছেলে মুসলিম হওয়ায় ভর্তির সময় চরম বিরোধীতা করে বিবাদ করেছিলেন  প্রধান শিক্ষক ও হস্টেল সুপার”–এফআইআরে লিখেছেন পিতা সফিকুল গাজী। গত ২০ এপ্রিল হস্টেলে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায় ১৩ বছর বয়সের শরিফুলকে। পরিবার একে স্বাভাবিক মৃত্যু হিসেবে মেনে নেয়নি। অনেক টালবাহানার পর তমলুক থানা এফআইআর নিয়েছে বটে তবে সমগ্র বিষয়টি ধামাচাপা দিয়ে দেওয়ার আশঙ্কা করছেন পরিবারের লোকেরা।

গতকাল বিকালে পোস্ট মর্টেমের পর মৃতদেহ নিয়ে তমলুক চৌমাথায় অবস্থান বিক্ষোভ ও ঘন্টা দুয়েকের জন্য পথ অবরোধ করেন স্থানীয় সাধারণ মানুষ ও অল ইন্ডিয়া মাইনোরিটি অ্যাসোসিয়েশনের(আইমা) নেতা কর্মীরা। আইমার পক্ষ থেকে সানাউল্লাহ্ খান বলেন-“প্রশাসন যদি আগামী ৭২ ঘন্টার মধ্যে অপরাধীদের গ্রেপ্তার না করে তবে তার পরিনতি হবে ভয়ানোক।” তমলুক থানার পক্ষ থেকে অপরাধীদের গ্রেপ্তার ও সর্বোচ্চ শাস্তির আশ্বাস দিলে অবরোধ উঠে যায়।
এর পরেই কফিন বন্দি শরিফুলের মৃতদেহ তমলুক থেকে বসিরহাটের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। আজ দুপুর ১ টা নাগাদ কাটিয়াহাট দক্ষিণ পাড়াতে তার নিজ বাড়ি নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।
মেধাবী এই ছাত্রের মৃত্যুতে শোকস্তব্ধ বসিরহাটের বিস্তীর্ণ এলাকা। পরিবারের দাবী-“ছেলেকে গলাটিপে ও পুরুষাঙ্গে আঘাত করে হত্যা করা হয়েছে। সমস্ত শরীরের পাশা পাশি গোপনাঙ্গে গভীর ক্ষত লক্ষ্য করা গেছে। ” যদিও এখনো পর্যন্ত ময়নাতদন্তের রিপোর্ট হাতে পাননি শরিফুলের পরিবার।
আজকের এই নামাজে জানাজায় উপস্থিত ছিলেন বাদুড়িয়া বিধানসভার প্রাক্তন বিধায়ক মহম্মদ সেলিম, বসিরহাটের সাংসদ ইদ্রিস আলি, বাদুড়িয়া পৌরসভার চেয়ারম্যান তুষার সিং, কবিদাস, বাদুড়িয়ার বিধায়ক আব্দুর রহিম (দিলু), অল ইন্ডিয়া সুন্নত অল জামাতের কর্ণধার মুফতি আব্দুল মাতিন, সারা বাংলা সংখ্যালঘু যুবফেডারেশনের সম্পাদক মহম্মদ কামরুজ্জামান সহ এলাকার একাধিক গণ্যমান্য ব্যাক্তিত্ব।
জানাজায় উপস্থিত সকলেই শরিফুলের হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবী তোলেন। সাংসদ ইদ্রিস আলি বলেন-“শরিফুলের হত্যাকারীরা কেউ রেহাই পাবে না।” তবে মুফতি আব্দুল মাতিন অপরাধীদের গ্রেপ্তারের বিষয়ে পুলিশি গড়িমসি নিয়ে একহাত নেন বর্তমান শাসকদলকে। তিনি বলেন-“শাসক দলের হস্তক্ষেপে প্রাতিটি জায়গাতে আজ অপরাধীরা রেহায় পেয়ে যাচ্ছে। যে কারনে অপরাধ জগতের পরিধি উত্তরোত্তর বেড়েই চলেছে।”
মহম্মদ কামরুজ্জামান বলেন -” প্রশাসন যদি অপরাধীদের গ্রেপ্তারের বিষয়ে তদন্তের নামে কালবিলম্ব করে তবে কিন্তু তার পরিনতি হবে ভয়াবহ। সুতরাং প্রশাসন ও রাজনৈতিক নেতারা আমাদের সাথে সহযোগিতা করবে এটাই আশা রাখি।”
তিনি টিডিএন বাংলাকে জানান,খুব শীঘ্রই মুখ্যমন্ত্রীকে আমি চিঠি দেবো। শরীফুল ইস্যুতে আন্দোলন করা হবে সকলকে নিয়ে।
এদিকে ছাত্র শরিফুলের মৃত্যু নিয়ে জামায়াতে ইসলামি হিন্দের রাজ্য সভাপতি মুহাম্মাদ নুরুদ্দিন জানান,”
মেদিনীপুর এর শ্রীরামপুর এগ্রিকালচার হাইস্কুল এর আবাসিক ছাত্র শরিফুল নিহত হয়েছে। ইন্নালিল্লাহি ও ইন্না ইলাইহে রাজিউন। তার মৃত্যু কে ঘুরে চরম উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে এলাকায়। শরিফুল ওই স্কুলের হোস্টেলে থাকতো। সে ক্লাস নাইনে পড়তো। তাকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ। সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ এর  কারণে এই জঘন্য কাজ করা হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। বসিরহাটের বাদুরিয়া থানার কটিয়া হাট থেকে সে পড়াশোনা করতে এখানে এসেছিল। এখন লাশ হয়ে তাকে ফিরে যেতে হচ্ছে। এ ঘটনা হৃদয় বিদারক সহ্য করা যায়না। শরিফুল এর বাবা মার কাছে মুখ দেখাবে কি করে এ সমাজ ।
অবশ্যই অপরাধীদের গ্রেফতার করে শাস্তি দিতে হবে।
আজ যেভাবে ঠান্ডা মাথায় পরিকল্পনা করে হিন্দু মুসলিমের মধ্যে বিদ্বেষ ছাড়ানো হচ্ছে তার মোকাবিলা করতে হবে শক্ত ভাবে। কোনো ভাবেই উত্তেজিত হয়ে প্ররোচনায় পা দেওয়া চলবেনা। তাহলে কুচক্রীদের উদ্দেশ্যই সফল হবে। আন্দোলন করতে হবে ঠান্ডা মাথায় ঐক্যবদ্ধ ভাবে। সকল ধর্মের অসাম্প্রদায়িক মানুষদের সামনে আনতে হবে। আসানসোল এর ইমাম মাওলানা ইমদাদুল্লা রাশিদি যে সবর ও হিকমতের পরিচয় দিয়েছেন তা থেকে শিক্ষা নিতে হবে।
রাজ্য সরকারকে শক্ত ভূমিকা পালন করতে হবে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত করতে হবে কড়া ভাবে। কোনো ভাবে অপরাধীদের রেয়াত করা চলবে না। পশ্চিম বঙ্গের সামনে আজ অশনি সংকেত। সামান্য ভুল হলে মহা বিপর্যয় নেমে আসতে পারে।
তাই আসুন সম্মিলিত ভাবে সম্প্রীতির পরিবেশ গড়ে তুলি।”