নিজস্ব ছবি

রেবাউল মন্ডল, টিডিএন বাংলা, গোসাবা : ওদের হাতুড়ির ঘায়ে ইঁট ভাঙার শব্দে ঘুম ভাঙে অনেকের। হাতে শাঁখা পলা, সিঁথিতে সিঁদুর, পরনে শাড়ি; শাড়ির উপরে একখানা ধুলোমলিন ছেঁড়া ফুলহাতা জামা। আর এসাজেই কাকভোরে নিজ নিজ বাড়ি থেকে হাতে কোদাল হাতুড়ি ঝুড়ি নিয়ে কাজে ছুটে এসেছে ওরা। কেননা ডিউটিতে যোগ দিতে হবে সাতটার আগেই।

গোসাবা ব্লকের দ্বীপগুলিতে পুরুষদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সমানে জন খাটে এই সব প্রমিলারাও। ওদের বাড়ির পুরুষরা কেউ গেছে ভিন রাজ্যে কেউবা নদীর বোটে মুটের কাজ করে কেউ বা টানে ভ্যান। ২০০৯ এর আয়লার ক্ষত সবে সেরে উঠেছে। রাজ্যের অন্যান্য জেলাগুলির মতো জমিতে সারা বছর চাষ নেই এখানে। চাষ বলতে শুধু ধান তাও আবার বছরে দু’বার। জলের জন্য ভরসা সেই আকাশ।

তাই আরো বেশি রোজগারের আশায় বাড়ির মহিলারাও বসে থাকে না। সুন্দরবনের মোল্লাখালি দ্বীপে দেখা গেল এমনই সব সদা কর্মচঞ্চল মহিলাদের। যারা রাস্তার কাজে কেউ ইঁট ভাঙছেন কেউ বা মাথায় ঝুড়ি করে বইছেন ইঁট। কেউ বা কোদাল চালাচ্ছেন দক্ষতার সাথে। এ কাজে হাতে ফোসকা পড়ে না? জিজ্ঞেস করতেই দুহাতে লাল রংয়ের ধুলো ঝেড়ে তালু দুটি দেখিয়ে দিল কৌশল মৃধা, সবিতা সরদার ও পুষ্প বর্মনরা। সটান জবাব, কই না তো! কিছু হয় না। সবই অভ্যেস হয়ে গেছে বাবু।
ভোর তিনটেই বিছানা ছেড়েছে ওরা। ছেলে মেয়েদের জন্য সারাদিনের রান্না সেরে নিজেদের জন্য কেটলি করে খাবার নিয়ে কাজে যোগ দিতে এসেছে ওরা। সারা দিনে দুবার খেতে যে হবে। সাতটায় কাজে যোগ দিয়ে প্রথম টিফিন দশটায়। ফের দুটোয়। কাজ চলবে পাঁচটা পর্যন্ত। সারাটা দিন হাড়ভাঙা পরিশ্রম শেষে ওরা হাতে পায় মাত্র দুশো টাকা। আর এই সামান্য রোজগার করেই সংসার চালিয়েও সমানে ছেলেমেয়েদের পড়াশোনাও চালিয়ে যাচ্ছে লক্ষী সরদার, সরস্বতী বর্মনরা।

এদিন সীতা মণ্ডল টিডিএন বাংলাকে বলছিলেন, আমরা স্বামী-স্ত্রী উভয়ই এই রাস্তার শ্রমিকের কাজ করি। আর এভাবেই তিন মেয়ের বিয়েও দিয়েছি। ছোট মেয়েটা এখন একাদশ শ্রেণীতে পড়ে। আমরা ওকে অনেক দূর পড়াতে চাই। সুভদ্রা বর্মন দুপুরের খাবার শেষে গালে একখানা পান চিবোতে চিবোতে বলছিলেন, আমাদের এভাবেই হেসে খেলে দিন কেটে যায়। আমাদের বেশি কিছু আর চায়না। ছেলেটা অষ্টম ও মেয়েটা নবম শ্রেণীতে পড়ছে। ওদের টিউশন বই খাতার জন্য এটুকু কষ্ট তো করতেই হয়।’

আর এভাবেই প্রত্যন্ত এই এলাকার আদিবাসীরা স্বপ্ন দেখে সন্তানদের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের। ম্যানেজারের কড়া নির্দেশ বিকেল পাঁচটার আগে কাজ ছাড়ার হুকুম নেই। সেই সকাল সাতটা থেকে পাঁচটার মাঝে দুবার দু ঘণ্টা বিরতি এরই মাঝে ৮ ঘণ্টা ধরে বিরামহীন চলতে থাকে ওদের হাত।