টিডিএন বাংলা ডেস্ক : ভাগ্যের কাছে হার মানেনি সুস্মিতা। জন্মের সময়ে ভাগ্যবিড়ম্বনার লিখন, সে এককথায় উড়িয়ে দিয়েছে। তৈরি করেছে নতুন দৃষ্টান্ত।

জন্ম থেকে তার দু’হাত নেই। তবুও সে হার মানেনি। কঠিন অধ্যবসায় ও অদম্য মানসিক জোরে পা দিয়ে লিখে মাধ্যমিক পরীক্ষা দিচ্ছে সুস্মিতা মণ্ডল। সে যে আলাদা নয়, তা বুঝিয়ে দিয়েছে তার কাজে। অর্থাৎ প্রতিবন্ধকতাকে সে বিশ্বাস করে না। তাই আর পাঁচটা পরীক্ষার্থীর সঙ্গে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই শেষ করল সে। মধ্যশিক্ষা পর্ষদ নিয়ম মতো তার জন্য রাইটার নিযুক্ত করেছিল। কিন্তু আত্মবিশ্বাস এতটাই দৃঢ় ছিল যে পরীক্ষার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত রাইটারের সাহায্য একবারের জন্যও নেয়নি সুস্মিতা। সে প্রমাণ করল যে সে স্বতন্ত্র, স্বতন্ত্র তার মনের জোরে, তার অদম্য জেদে। তাই তো সে অনন্যা। নিষ্ঠাকে আশ্রয় কের কীভাবে প্রতিবন্ধকতাকে চ্যালেঞ্জ করা যায়, তা হাতেনাতে প্রমাণ করল এই মেয়ে। বিধানগরের সেন্টার ইনচার্জ সামসুল আলম বলেন, আমরা এক যুদ্ধ জয়ের প্রথম পর্যায়ের সাক্ষী থাকলাম। কঠোর পরিশ্রম ও আত্মবিশ্বাসে ভর করে যথেষ্ট দক্ষতার সঙ্গেই পরীক্ষা শেষ করে সকলকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে সুস্মিতা। আমরা শুনেছি ওর পরিবার আর্থিকভাবে স্বচ্ছল নয়। সেক্ষেত্রে তার নানা প্রতিবন্ধকতা রয়েছে উচ্চশিক্ষায়। তবে সুস্মিতা যেভাবে এগিয়ে চলেছে তাতে এটা একবাক্যেই বলা যায় যে কোনও বাধাই তার কাছে প্রতিবন্ধকতা হবে না। শিলিগুড়ি মহকুমার ফাঁসিদেওয়া ব্লকের বিধাননগর এলাকার মিলনপল্লির বাসিন্দা সুস্মিতা। জন্ম থেকেই ২টি হাত নেই। হাতের কাজ সবটাই পা দিয়েই সারে সুস্মিতা।

পড়াশুনোর সঙ্গে সমান তালে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে নিজের ভালোলাগা। পা দিয়ে তুলির টানে তার ক্যানভাসে ফুটে ওঠে গ্রাম বাংলার ছবি। সেই সঙ্গে তার মনের ক্যানভাসে জন্ম নেয় অনেক রঙিন ছবি। যা সাকার করতে মরিয়ে এই লড়াকু মেয়েটি। তার আঁকা ছবি স্থান পেয়েছে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়।

শারীরিক প্রতিবন্ধকতার কাছে হার মানেনি সুস্মিতা। কিন্তু অভাব, অনটন আর দারিদ্র্য মাঝে মধ্যেই তাকে বড় অসহায় করে তোলে।
সন্তোষীনি বিদ্যাচক্রের ছাত্রী সুস্মিতা। তার পরীক্ষা কেন্দ্র পড়েছে মুরলিগছ হাই স্কুলে। এদিন মায়ের সঙ্গে গুটি গুটি পায়ে পরীক্ষা কেন্দ্রে পৌঁছায় সে। সুস্মিতা বলে, আমি পা দিয়েই লিখি। আমি তাতে স্বচ্ছন্দ্য। কোনও অসুবিধে হয় না। আমি পড়াশোনা করে আগামীতে শিক্ষিকা হতে চাই।

সুস্মিতারা দুই বোন ও এক ভাই। তার দিদি বর্তমানে আইটিআই পড়েন। তার দাদা দিনমজুরি করেন। সুস্মিতার বাবা সুভাষ মণ্ডলও পেশায় দিনমজুর। সংসারের জোয়াল টানতে কাজে যোগ দেন তার মা অঞ্জলি দেবী। তিনি সংসারের মূল রোজগেরে। বর্তমানে তিনি স্থানীয় একটি চা বাগানে দিনমজুরি করেন। সেক্ষেত্রে মা ও ছেলের হাড় ভাঙা খাটুনির সামান্য কিছু রোজগারের টাকায় চলে সংসার। অঞ্জলি দেবী বলেন, কোনওমতে দিনপাত হয় আমাদের। মেয়েদের উচ্চশিক্ষার কথা ভাবা আমার কাছে দুঃস্বপ্ন। তবে বড় মেয়ে কিছুটা সামাল দিয়ে উঠলেও সুস্মিতার পক্ষে তা সম্ভব নয়। তবে আশা রাখি সুস্মিতার অদম্য জেদের কাছে হার মানবে আমাদের অভাবও।

অন্যদিকে আরেক হার না মানা কাহিনী তৈরি হয়েছে শিলিগুড়ির বুকেই। অসুস্থতা নিয়েও পরীক্ষা দিচ্ছে আর এক লড়াকু মেয়ে। এদিন পরীক্ষাকেন্দ্রের বদলে শিলিগুড়ি জেলা হাসপাতালের সিসিইউ থেকে পরীক্ষা দিয়েছে ডাবগ্রাম- ২ গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকার বাসিন্দা প্রিয়াঙ্কা অধিকারী। প্রিয়াঙ্কার মা ধরণী অধিকারী বলেন, কিছুদিন ধরেই মেয়ে জ্বরে আক্রান্ত। তিনদিন আগে তাকে শিলিগুড়ি জেলা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, বুকে সংক্রমণ হয়েছে। চিকিৎসা চলছে। তবে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েনি আমার মেয়ে। শুরু থেকেই সে পরীক্ষায় বসার ক্ষেত্রে জোর দিচ্ছিল। সেক্ষেত্রে স্কুলের তরফে সবরকম ব্যবস্থা করা হয়। আমি খুশি যে আমার মেয়ে পরীক্ষা দিতে পেরেছে।

চলছে মাধ্যমিক, উৎকণ্ঠা আর রাশি রাশি টিফিন সঙ্গে নিয়ে পরীক্ষা কেন্দ্রের সামনে দাঁড়িয়ে থাকে বাবা-মায়েরা। ছেলে -মেয়ে মাধ্যমিক দিচ্ছে বলে কথা! বাবা-মায়ের আয়োজনের শেষ নেই। আর প্রতিবন্ধকতাকে সম্বল করে যারা এগিয়ে যাচ্ছে, তারাই তো রচনা করছে এক অনন্য লড়াইয়ের আখ্যান। পরীক্ষা শেষ হবে। কিন্তু মিলিয়ে যাবে না সুস্মিতাদের লড়াইয়ের ইতিবৃত্ত।