টিডিএন বাংলা ডেস্ক: আবার সামনে এলো চাঞ্চল্যকর তথ্য। কেন্দ্রীয় সরকারের রিপোর্ট অনুযায়ী গণশক্তি পত্রিকা একটি খবর প্রকাশ করেছে। তাতে বলা হচ্ছে, রাজ্যের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ছেলেমেয়েদের স্কুলছুটের হার উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। মাধ্যমিক স্তরে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ছেলেমেয়েদের স্কুলছুটের হার ২২শতাংশ। অন্যদিকে উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের স্কুলছুটের হার ২১শতাংশ। কেন্দ্রীয় মানব সম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রকে দেওয়া রাজ্যের সর্বশিক্ষা মিশন-ই এই তথ্য জানিয়েছে। তথ্য দেওয়ার পাশাপাশি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ছেলেমেয়েদের স্কুলছুটের হার বেড়ে যাওয়ার পেছনে পাশ-ফেল প্রথা ও পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকার কারণ হিসাবে প্রাথমিক রিপোর্টে উল্লেখ করেছে সর্বশিক্ষা মিশন। শুধু সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ছেলেমেয়েদের স্কুলছুটের সংখ্যা বাড়ছে তা নয়, সামগ্রিকভাবে সরকারি স্কুলগুলিতে স্কুলছুটের সংখ্যা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। ইউনাইটেড ডিস্ট্রিক্ট ইনফরমেশন সিস্টেম অব এডুকেশনের (ইউ–ডাইস) হিসাব বলছে, ‘২০১৫-১৬ সালের তুলনায় ২০১৬- ১৭ সালে এক ধাক্কায় সরকারি স্কুলগুলিতে ভর্তির হার ৪.৯শতাংশ কমেছে। ওই দুই শিক্ষাবর্ষে রাজ্যে স্কুলছুট ১৮.৫৯শতাংশ থেকে বেড়ে ২৩.৬৭শতাংশ হয়েছে।’ সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ছেলেমেয়েদের সঙ্গে সামগ্রিকভাবে রাজ্যে স্কুলছুটে হার বাড়ার কারণ হিসাবে শিক্ষকের অপ্রতুলতার কথা বলেছে সর্বশিক্ষা মিশন। মিশনের রিপোর্টে বলা হয়েছে, ‘মাধ্যমিক স্তরের ৭২শতাংশ স্কুলে চারটি বিষয় শিক্ষক নেই। একইভাবে ৪২শতাংশ উচ্চ প্রাথমিক স্তরে তিনটি বিষয়ের শিক্ষক নেই।’ সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ছেলেমেয়েরা যাতে প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থার সমতুল্য হতে পারে তারজন্য বামফ্রন্ট সরকারের সময় মাদ্রাসা শিক্ষার উপর জোর দেওয়া হয়েছিল। মাদ্রাসা শিক্ষাকে আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত করে পাঠ্যসূচি, পাঠ্যক্রম পরিবর্তন করা এবং মাধ্যমিকের সমতুল্য করা হয়েছিল। শিক্ষক নিয়োগের জন্য মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশন গঠন করা হয়েছিল। একইসঙ্গে প্রচলিত স্কুলগুলিতে শিক্ষক জোগান দিত স্কুল সার্ভিস কমিশন। গত বছর পশ্চিমবঙ্গের বহু স্কুলে প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষক পদ তৈরিতে দিল্লি অনুমোদন দিলেও , আজ পর্যন্ত নিয়োগ হয়নি। ৭ বছরের মধ্যে মাত্র দুইবার এসএসসি মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ হলেও চাহিদার তুলনায় অত্যন্ত কম। ফলে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের অভাব দেখা দিয়েছে একাধিক স্কুলে। অন্যদিকে মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশন থেকে মাত্র একবারই নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হয়েও মাঝপথে সেই নিয়োগ থমকে রয়েছে। দুই কমিশনের মাধ্যম দিয়ে ধারাবাহিকভাবে শিক্ষকের জোগান থাকার কারণে মাদ্রাসা ও প্রচলিত স্কুলগুলির পঠনপাঠন ও সরকারি স্কুলে ভর্তির হার তিন দশক ধরে বাড়ার পর, তৃণমূলের ৭বছরের জমানায় শিক্ষার মান তলানিতে এসে ঠেকেছে। তবে স্কুলছুট হার কমাতে রাজ্যের শিক্ষা দপ্তর বেশ কয়েকটি উদ্যোগ নিয়েছে ঠিকই, কিন্তু তাতে কাজ হবে বলে সন্দিহান অনেকেই। শিক্ষা দপ্তরের এক কর্তা জানান, ‘স্কুলছুটদের স্কুলে এনে তাদের জন্য বিশেষ ক্লাস নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে অভিভাবকদের মধ্যে সচেতনতা না বাড়লে কিছু করার নেই। কয়েক বছর ধরে সরকারি স্কুলগুলিতে ভর্তির সংখ্যা কমার পাশাপাশি স্কুলছুটের সংখ্যা বাড়ার অন্যতম কারণ বেসরকারি স্কুলগুলির প্রতি অভিভাবকদের মোহগ্রস্ত হয়ে পড়া। নম্বর তোলার জন্য অভিভাবকরা এখন সর্বভারতীয় বোর্ডগুলির স্কুলগুলিতে তাঁদের সন্তানদের ভর্তি করান। কলকাতা ছাড়াও শহর ও শহরতলির স্কুলগুলিতে একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।’ তবে শিক্ষা দপ্তরের ওই কর্তার সঙ্গে একমত নন নিখিলবঙ্গ শিক্ষক সমিতি’র সাধারণ সম্পাদক সুকুমার পাইন। তিনি বলেন, ‘অভিভাবকদের মধ্যে কেন এই প্রবণতা তৈরি হলো এবং এরজন্য সরকার নিজের দায় এড়াতে পারে না। শিক্ষক নিয়োগে ঢিলেঢালা মনোভাব কেন? বিষয়ের শিক্ষক নেই বলে চলতি শিক্ষাবর্ষে বহু স্কুলে বিজ্ঞান শাখায় ছাত্র-ছাত্রী ভর্তি করেনি। তাছাড়া অভিভাবকরা জেনে গিয়েছেন, এখন সরকারি স্কুলে পঠনপাঠনের থেকে সরকারি প্রকল্পের কাজ বেশি হয়। অভিভাবকদের দোষ দিয়ে লাভ নেই, স্কুলছুটের সংখ্যা কমাতে সরকারের সদিচ্ছা আছে কী? যদি থাকতো তাহলে তিন বছর আগেই ব্যবস্থা নিতে পারতো।’ সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ছেলেমেয়েদের স্কুলছুটের হার বাড়ার কারণ হিসাবে মাদ্রাসার এক শিক্ষকের মত, ‘মূলত পাঁচটি জেলায় সংখ্যালঘু ছাত্র-ছাত্রীর হার বেশি। মালদহ, মুর্শিদাবাদ, উত্তর দিনাজপুর, উত্তর ও দক্ষিণ ২৪পরগনা। উত্তর দিনাজপুরের বহু স্কুলের সংখ্যালঘু ছাত্র-ছাত্রী স্কুলে আসা বন্ধ করে দিয়েছে পাশ-ফেল চালুর ভয়ে। এরা প্রথম প্রজন্মের সন্তান। তাদের অভিভাবকদের বুঝিয়েও কোনও লাভ হচ্ছে না।’