বাড়ি বাড়ি গিয়ে ছেলেমেয়েদের সচেতন করছেন শিক্ষক রেবাউল মন্ডল। মোল্লাখালী, সুন্দরবন। নিজস্ব ছবি।

নিজস্ব সংবাদদাতা, টিডিএন বাংলা, সুন্দরবন: সুন্দরবনের গোসাবা ব্লকে ১০ শতাংশ সংখ্যালঘুর বাস। প্রত্যন্ত এই এলাকায় পিছিয়ে রয়েছে তারা। নেই উন্নত রাস্তাঘাট, ভালো যোগাযোগ ব্যবস্থা। বিভিন্ন বিষয়ে তেমন সচেতনা নেই। কারও বা বাবা কারও বাবা মা উভয়েই রোজগারের আশায় পড়ে থাকে ভিন রাজ্যে। এই সমস্ত পরিবারের সন্তানদের নাম বিদ্যালয়ে থাকলেও নিয়মিত হাজিরা তাদের কম।
এই ব্লকের রাধানগর-তারানগর গ্রাম পঞ্চায়েতের অধীন তারানগর গ্রামের সংখালঘু পড়ুয়ারা যায় পূর্ব তারানগর
এফপি স্কুলে। বিদ্যালয়ের মোট পড়ুয়ার সংখ্যা ১২৪, যার মধ্যে ২১জন সংখ্যালঘু।

ঐ সংখালঘু পড়ুয়াদের স্কলারশিপের বিষয়ে সচেতন করে স্কুলমুখী করতে উদ্যোগী হয়েছে স্কুল। শিক্ষকরা পড়ুয়াদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ও ফোন মারফত ছাত্র ছাত্রীদের বাবা মা কে বোঝাচ্ছেন যাতে ঐ ২১ জন পড়ুয়ার সকলেই অনলাইনে ফরম পূরণ করে। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক অচিন্ত্য কুমার মন্ডল জানান, বিদ্যালয়ের সব মাইনোরিটিরা যাতে অনলাইনে আবেদন করে তার জন্য শিক্ষক রেবাউল মন্ডল, কুদ্দুস আলী মন্ডল, সাহার আলী লস্কর বাড়ি বাড়ি গিয়ে বলে এসেছেন। ওনারা নিজেদের ল্যাপটপ নিয়েও গ্রামে ঘুরে কয়েক জনের ফর্ম ফিলাপ করিয়ে দিয়েছেন। আমি নিজেও অনেককে ফোনে বলেছি। কিন্তু এখনো অর্ধেকের একাউন্টই হয়নি।

ঐ স্কুলের শিক্ষক রেবাউল মন্ডল। তিনি সেই নদীয়া জেলার করিমপুর থেকে এসে শিক্ষকতা করছেন। সারাজীবন ছাত্রছাত্রীদের স্কলারশিপ নিয়ে কাজ করেছেন। ছেলেমেয়েদের স্কুলমুখী করেছেন। তিনি বলছিলেন, “এলাকাটি পিছিয়ে পড়া। স্কুলে অনিয়মিত সংখ্যালঘু পড়ুয়ারা। গত বছরও বাড়ি বাড়ি তথ্য জোগাড় করে ফর্মফিলাপ করানো হয়েছিল। যাতে করে ঐ সমস্ত দরিদ্র পরিবারের পড়ুয়ারা স্কলারশিপের টাকাটা পেয়ে স্কুলমুখী হয়। কিন্তু সকলে টাকা না পাওয়ায় এবছর আর আবেদন করতে চাইছেন না অনেকেই। আর তাই ফের বাড়ি বাড়ি যাচ্ছি আর বোঝাচ্ছি।”

যদিও সরকারিভাবে পঞ্চায়েতে চারদিনের বিশেষ শিবির করে সংখ্যালঘুদের ফর্ম ফিলাপ করানো হয়েছে। তবুও সেখানে যেতে নারাজ অনেক অভিভাবকই। সাজাদুল মোল্লা আব্দুল খালেক মোল্লা, অজিত আলী, হান্নান মোল্লাদের বক্তব্য, “এসব করে কী আর হবে? গেল বার অনলাইনে আবেদন করা হয়েছিল, কিন্তু ছেলেরা টাকা পেল কই? বছর বছর শুধু দৌড়াদৌড়ি। স্কলারশিপ আর পাওয়া যায়না।”

অনেকের এখনো হয়নি কোন ব্যাংক একাউন্ট। কারণ জানতে চাইলে অভিভাবক সফিউদ্দিন মোল্লা, মকর আলী, সারজেদ শেখদের বক্তব্য-বারবার ব্যাংকে গিয়ে হয়রান হচ্ছি। বলছে ফরম নেই। আজ নয়, অন্য দিন আসুন। একদিন ব্যাংকে গেলে সেদিনটাই মাটি। ঐদিন আর কোন কাজ পাইনা। আবার ৫০০টাকা জমা না রাখলে হবে না একাউন্ট। আমরা গরিব মানুষ, ৫০০ টাকা খাতায় রাখলে খাবো কি?”

সাবেরা খাতুন নামে এক অভিভাবক জানালেন, গত বছর স্কুলের ঐ মাস্টারমশাই পাড়ায় ঘুরে আমাদের পাড়ার ১৫ জন ছাত্রছাত্রীর ফর্ম ফিলাপ করিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু টাকা পেয়েছে মাত্র দুজন। ফলে মাইনোরিটি স্কলারশিপের প্রতি আমাদের আস্থা কমছে।
কিন্তু সেই দূর সুন্দরবনের মোল্লাখালীর এইসব গ্রামের ভরসা এখন শিক্ষক রেবাউল মন্ডল। কেননা, তিনিই নিজের সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রশ্নে ছুটছেন এ গ্রাম থেকে সেই গ্রাম। স্কুলে যাবার আগে কিংবা বিকেলে স্কুল থেকে ফিরে ছাত্রছাত্রীদের বিভিন্ন সুযোগ সুবিধার কথা বলে স্কুলমুখী করছেন রেবাউল মন্ডল। কিন্তু কেন এই কাজ করছেন? টিডিএন বাংলাকে ওই শিক্ষকের ছোট্ট জবাব,”ছাত্রছাত্রী ছাড়া শিক্ষকের মূল্য কী? পড়ুয়াদের জন্য যা কিছু ভালো সেটা করার চেষ্টা করছি।”