বক্তব্য রাখছেন আমিনাল হক

নিজস্ব প্রতিনিধি, টিডিএন বাংলা, কোচবিহার: নস্যশেখ উন্নয়ন পর্ষদ গঠন করে অবিলম্বে তাদের ভূমিপুত্র হিসেবে স্বীকৃতি দেবার দাবি সহ একাধিক দাবিতে সোমবার জলপাইগুড়ি জেলায় মিছিল করল নস্যশেখ উন্নয়ন পরিষদ। জলপাইগুড়ি জেলার রাজবাড়ী ময়দানে সমবেত হয়ে মিছিলটি জেলা শাসকের দপ্তরে পৌঁছায়। মিছিলে নেতৃত্ব দেন পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির সম্পাদক আমিনাল হক ও কেন্দ্রীয় সভাপতি বজলে রহমান। সেখানে পরিষদের এক প্রতিনিধিদল জেলা শাসকের কাছে স্বারকলিপি প্রদান করেন, তাদের দাবিগুলোর গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করেন।

নস্যশেখ উন্নয়ন পরিষদের জলপাইগুড়ি জেলার মিছিল


জানা গেছে এদিনের মিছিলে পা মেলান হাজার হাজার মানুষ। তাদের দাবি, ১৯৭১ সালের আগের পুরানো ভোটার লিস্ট, পুরানো জমির দলিল ও খতিয়ানের প্রতিলিপি পঞ্চায়েত ও ব্লকে পৌঁছে দিতে হবে। সেই সাথে কামরূপী ভাষায় পঠন পাঠন সহ কামপুরী ভাষাকে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দিতে হবে।

পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির সম্পাদক আমিনাল হক বলেন, নস্য শেখ জনগোষ্ঠী উত্তরবঙ্গের আদি বাসিন্দা। বর্তমানে আর্থ সামাজিক ও শিক্ষা চাকরির ক্ষেত্রে তারা পশ্চাদপদ ও ওবিসি তালিকাভুক্ত। ৬০ শতাংশ নস্যশেখ ভূমিহীন শ্রমিক। তারমধ্যে প্রায় ৩০ শতাংশ ভিনরাজ্যে শ্রমিকের পেশায় নিযুক্ত। তিনি আরও বলেন, উত্তরবঙ্গের গ্রাম শহরে সমস্ত নিম্ন আয় ও শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে তাদের সংখ্যাই বেশি। ওবিসি তালিকা ভুক্ত হয়েও তারা চাকরি ও কর্মহীনতায় ভুগছে। কৃষকরাও নানা সংকট ও সমস্যার সম্মুখীন। তাঁর অভিযোগ, সমগোত্রীয় প্রতিবেশী রাজবংশী, নমঃশুদ্র, মতুয়া, আদিবাসী, লেপচাদের জন্য স্বতন্ত্র উন্নয়ন পর্ষদ গড়া হলেও তৃণমূল সরকার আজ অব্দি নস্য শেখ উন্নয়ন পর্ষদ গঠন করেনি।


কোচবিহার থেকে জলপাইগুড়ি, দার্জিলিং কিংবা দিনাজপুর। নস্যশেখ আন্দোলন উত্তরবঙ্গে অন্য মাত্রা পেয়েছে। শিক্ষিত ও সুশীল সমাজের একটা বড় অংশ এই দাবির সঙ্গে একমত বলে জানা যাচ্ছে। বজলে রহমান, পাসারুল আলম সহ উত্তরবঙ্গের জনপ্রিয় নেতারা এই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত।
কিন্তু কে এই আমিনাল হক যার এত প্রভাব? জানা গেছে, তিনি দিনহাটার একটি স্কুলের শিক্ষক। সেই সঙ্গে সংগীত ও ভাষার উপর চর্চা করেন। রাজ্য সরকারের কামতাপুর ভাষা একাডেমির সদস্য।


কিন্তু কেন হটাৎ তিনি এত জনপ্রিয় হলেন? কেন তাঁর ডাকে হাজার হাজার মানুষ পথে নামছে? এই প্রশ্ন উঠছে উত্তরবঙ্গে। জানা গেছে, তিনি উত্তরবঙ্গের বঞ্চিত মানুষকে এক করতে চেয়েছেন এবং এই কাজ বহুদিন ধরে করছেন। তবে অসমের এনআরসির তালিকা প্রকাশিত হওয়ার পর এই ইস্যুতে মানুষকে এক করতে থাকেন। সঙ্গে পেয়ে যান দক্ষিণ দিনাজপুরের জনপ্রিয় নেতা পাসারুল আলম, কামতাপুরী ভাষাবিদ বজলে রহমান, উত্তর দিনাজপুরের বলিষ্ঠ নেতা মোহাম্মাদ সারওয়ারদি, শিলিগুড়ির আকসরুল আলম,জলপাইগুড়ির বাচ্চু প্রধান ও ফড়িত গাজী,কোচবিহারের মুহাম্মদ নাসিরউদ্দিন, কাউসার আলম ব্যাপারী, আলিপুর দুয়ারের মিন্টু আলী মন্ডল প্রমুখ বিশিষ্টজনদের। সেই সঙ্গে বিভিন্ন জেলায় টিম তৈরি করেন। সেই টিম এলাকায় এলাকায় প্রচার শুরু করে। তাই উত্তরবঙ্গের প্রতিটি জেলায় ডিএম অভিযানে ব্যাপক লোক হচ্ছে। আসলে একদিকে এনআরসি আবেগ অন্যদিকে উত্তরবঙ্গের নস্যশেখ মুসলিমদের ভূমিপুত্র ঘোষণার দাবি,আমিনালদের জনপ্রিয়তাকে বাড়িয়ে দিয়েছে।

সাংবাদিকদের মুখোমুখি আমিনাল হক, বজলে রহমান প্রমুখ


কিন্তু এর রাজনৈতিক লাভ কে তুলবে? কেননা সোমবার কোচবিহার শহরে দলের বিজয় সম্মিলনী অনুষ্ঠানে সুব্রত বক্সির উপস্থিতিতে কয়েক হাজার নির্বাচিত নেতা কর্মীদের সামনে তৃণমূল কংগ্রেসের দিনহাটার বিধায়ক ও একদা ফরওয়ার্ড ব্লকের নেতা উদয়ন গুহ আমিনালের আন্দোলনের বিষয়ে বক্তব্য দিয়েছেন বলে জানা গেছে। এমনকি ওই এলাকায় রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে যাওয়ার আশঙ্কাও তিনি করছেন। গত বিধান সভায় আমিনাল হক তাঁর বিরুদ্ধে ওয়েলফেয়ার পার্টির হয়ে ভোটে দাঁড়িয়েছিলেন বলেও উল্লেখ করেন উদয়ন বাবু। কিন্তু আমিনাল হক টিডিএন বাংলাকে বলেন,’আমাদের দুটি দাবি মেনে নিলেইতো হয়। এক সময় উদয়ন গুহ বামফ্রন্টের বিধায়ক ছিলেন। সেই সময় সংখ্যালঘু দপ্তরের একটা শাখা উত্তরবঙ্গে নিয়ে আনতেই পারতেন,সেটা হলে ভালো হত। তিনি এখন শাসক তৃণমূল কংগ্রেসের নেতা ও বিধায়ক। উদয়ন বাবুর সঙ্গে আমার কোনও শত্রুতা নেই।


মুখ্যমন্ত্রীকে বলে নস্যশেখদের ভূমিপুত্র ঘোষণা করতে বলুন। সেই সঙ্গে উন্নয়ন বোর্ড করে দিতে বলুন। আমাদের ভূমিপুত্র ঘোষণা করলেই এনআরসি সমস্যা মিটে যায়। আমাদের সমস্যা আমরা না বললে কে বলবে? আর রাজনীতি? নীতি নৈতিকতা ও মূল্যবোধ রাজনীতিতে দরকার। গণতান্ত্রিক দেশে কেউ কারও প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, আমরা সবাইকে প্রতিযোগি ভাবি এবং আদর্শের লড়াই করি। এখানে কেউ কারও শত্রু নয়। বহুত্ববাদী দেশে মানুষের রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও বিবিধ রূপ পরিলক্ষিত হয়, তবে আমাদের মনে রাখতে হবে তা যেন মানুষের কল্যাণের জন্য হয়। একটা সমাজকে পিছিয়ে রাখা হবে, একটা সমাজকে নেতৃত্ব থেকে বঞ্চিত করা হবে- এটা ঠিক নয়। সংবিধান সকলকে আন্দোলন করার, দেশ গঠনে ভূমিকা রাখার অধিকার দিয়েছে।’
আমিনাল বাবু আরও বলেন, আমাদের লড়াই তৃণমূল,বামফ্রন্ট বা কংগ্রেসের বিরুদ্ধে নয়। আমাদের আন্দোলন অধিকার আদায়ের আন্দোলন। মুখ্যমন্ত্রী আশা করি আমাদের দাবি মেনে নেবেন। আমরা খুব দ্রুত তাঁর সঙ্গে দেখা করবো। মুখ্যমন্ত্রী আমাকে ভাষা একাডেমির সদস্য করেছেন, বজলে রহমানকে চেয়ারম্যান করেছেন। ভূমিপুত্র ও উন্নয়ন বোর্ডের দাবিও আশা করি মুখ্যমন্ত্রী মেনে নেবেন।