জ্যোৎস্না বেগম, টিডিএন বাংলা : ভাঙনে ভেঙেছে ঘর। তবুও ভাঙা হেঁসেলটা জোড়া লাগানোর চেষ্টা চলে যখন পাশে কেউ এসে বলে, ‘ভয় নেই, বিপদ কাটবে কাল।’ উত্তরবঙ্গে বন্যার জলে লন্ডভন্ড হয়েছে বাড়ি ঘর, সাজানো সংসার।

এই দুর্দিনে ত্রাতার ভূমিকা নিয়ে মানুষের দরজায় দরজায় ত্রাণ নিয়ে যাচ্ছে জামাতে ইসলামি হিন্দ, এসআইও, ওয়েলফেয়ার পার্টি, ফেটারনীটি মুভমেন্টস ও হিউম্যান ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন। প্রত্যেকটি সংগঠন এক যোগে মানুষের জন্য কাজ করছে দিনরাত। নিজের মুখে খাবার উঠেছে কিনা ভুলে গিয়ে এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রামে নৌকা করে খাবার নিয়ে যাচ্ছেন কর্মীরা। আদিবাসী থেকে হিন্দু-মুসলিম, উত্তরবঙ্গের অসহায় মানুষের জন্য ছুটে বেড়াচ্ছে ওয়েলফেয়ার, জামাত-এসআইও। মালদা, কুচবিহার ও দক্ষিণ দিনাজপুরে ব্যাপক ভাবে ত্রাণের কাজ করছে সংগঠনগুলি।

পুরুষদের পাশাপাশি মহিলারাও ত্রাণের কাজ করছেন। দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার হরিরামপুর ব্লকে ক্যাম্প করে শিশুদের জন্য বিশেষ শিশু খাদ্য বিতরণ করা হয়,যা অনেকের নজর কাড়ে। মালদা জেলার বন্যা দূর্গতদের জন্য সাহায্য করতে বুধবার সামসিতে যান জামাতে ইসলামি হিন্দের রাজ্য সভাপতি মুহাম্ম নুরুদ্দিন। তিনি জানান, “আমরা প্রানপন চেষ্টা করছি যাতে অসহায় মানুষ গুলি একটু আশ্রয় পায়, সাহায্য পায়।

কিন্তু শুধু আমাদের সাহায্য যথেষ্ট নয়, কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারকে স্নেহময়ী মায়ের মত ভূমিকা নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। সেই সাথে বাংলার সমস্ত মানুষের উচিৎ উত্তর বঙ্গের দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়ানো। কেননা, মানুষ চায়ছে একটু সহযোগিতা।” আমীর এ হালকা অভিযোগ করে বলেন, “মালদা জেলার বিস্তীর্ন অঞ্চলে সরকারি ও বেসরকারি কোনও ত্রাণ সেই ভাবে পৌঁছায়নি। কঠিন সমস্যার মধ্য দিয়ে মানুষের দিন কাটছে। রাস্তার ওপর ঘুরছে সাধারণ মানুষ। বাড়ি নেই, খাবার নেই। শুধু মুসলিম এলাকা নয়, আদিবাসী ও দলিতদের মাঝেও আমি নিজ হাতে ত্রাণ তুলে দিয়েছি। সরকারের উচিৎ অবিলম্বে এই সব মানুষদের পাশে দাঁড়ানো।” জানা গেছে বন্যায় সংখ্যালঘু গরিব মানুষদের বাড়ি বেশি ভেঙেছে।


ওয়েলফেয়ার পার্টির মালদা জেলা সভাপতি শাজাহান আলি বলেন, “আমরা চাঁচল-২ ব্লকের ধানগাড়া, ক্ষেমপুর গ্রাম পঞ্চায়েত, হরিশ্চন্দ্র পুর-২ গ্রাম পঞ্চায়েতের মাশালদাহ, হরিশ্চন্দ্রপুর গ্রাম পঞ্চায়েত, ওল্ড মালদার মহিষবাথানি গ্রাম পঞ্চায়েত প্রভৃতি এলাকায় ত্রাণ বিতরণ করেছি। মানুষ ত্রাহি ত্রাহি করছে। অথচ রাজনৈতিক দলগুলি সেই রকম ভাবে বন্যা দুর্গত মানুষের কথা ভাবছে না। আমরা আমাদের সামর্থ অনুযায়ী অসহায় মানুষগুলির পাশে থাকার চেষ্টা করছি।”
বিস্তীর্ন এলাকায় জল থাকায় দুর্গত এলাকায় নৌকায় করে চিড়া, গুড়, লবন, মোমবাতি, দেশলাই, ঔষধ, বিস্কুট, পানীয় জল পৌঁছিয়ে দিচ্ছে এসআইও, জামাত ও ওয়েলফেয়ার। বুধবার প্রায় এক হাজার প্যাকেট খাবার বিলি করা হয়। স্টুডেন্টস ইসলামিক অর্গানাইজেশন অফ ইন্ডিয়া বা এসআইও-র কর্মীরা রাত জেগে খাবারের প্যাকেট তৈরি করছে।

জেলা নেতা সাবির আহমেদকে ত্রাণের কাজের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমরা এখন নৌকায় আছি। ত্রাণ নিয়ে যাচ্ছি ওই এলাকায়। চারিদিকে জল। পরে কথা বলবো।” এক হাটু জলে দাঁড়িয়ে একজন বৃদ্ধাকে খাবার তুলে দিচ্ছিলেন ফেটারনিটি মুভমেন্টসের রাজ্য সভাপতি আরাফাত আলি। তিনি বলেন, “আমরা বেসরকারি ভাবে আর কত সাহায্য করবো? স্কুলে স্কুলে ত্রান শিবির, তবুও স্কুল ছুটি ঘোষণা হয়নি।

বিভিন্ন জায়গায় পথ অবরোধ, বিডিও অফিস ঘেরাও, ভাঙচুর হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হরিশ্চন্দ্রপুর ২ ব্লক। নৌকা ছাড়া যোগাযোগ অসম্ভব। তাই ত্রাণ পৌঁছনো মুশকিল হচ্ছে। হাজার হাজার মাটির বাড়ি ভেঙেছে।ত্রিপল নেই বিদ্যুৎ নেই। মোবাইল টাওয়ার নেই।” শুধু মালদা নয়, কুচবিহার জেলাতেও জামাতে ইসলামি, ওয়েলফেয়ার পার্টি, ওয়েস্ট বেঙ্গল ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট ও এসআইও’র ছেলেরা ত্রাণের কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। তবে জামাতে ইসলামি হিন্দের রাজ্য সভাপতি বলছেন, “এটা একে অপরের বিরুদ্ধে দোষ দেবার সময় নয়। মানুষগুলিকে কিভাবে রক্ষা করা যায় তার জন্য সকলকে ময়দানে সাহায্য নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। বাংলার সকল মানুষের কাছে আমার আবেদন, জামাতে ইসলামি যাতে আরও বেশি করে ত্রাণের কাজ করতে পারে তার জন্য এই সংগঠনকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিন।”