টিডিএন বাংলা ডেস্ক: অসামের মতো এ রাজ্যেও নাগরিকপঞ্জি চালু হবে কিনা তা নিয়ে সংশয় ছিল। এবার সেই আশঙ্কা বাড়িয়ে দিল ভোটার তালিকা থেকে নাগরিক হিসেবে মুসলিমদের নাম বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হওয়ায়। ‘অপনি আর নাগরিক নন’ বলে নোটিশ পাঠানো হল ‘চতুরঙ্গ’ পত্রিকার সম্পাদক ও বিশিষ্ট সাংবাদিক-প্রাবন্ধিক আবদুর রাউফের পরিবারের সদস্যদের নামে। অসমে দেখা গিয়েছিল নাগরিকপঞ্জিতে হয়তো নাম রয়েছে বাবার, কিন্তু নাম বাদ গেছে স্ত্রী কিংবা পুত্রের। ঠিক সেই কায়দায় আবদুর রাউফকে রেহাই দেওয়া হলেও তার স্ত্রী মুসতাবসেরা রাউফ এবং তার পুত্র ড. আসাদ রাউফের নামে নোটিশ পাঠানো হয়েছে। প্রশ্ন তোলা হয়েছে ‘নাগরিকত্ব’ নিয়ে। এ যেন অসমের নাগরিকপঞ্জি এই রাজ্যেও অনুপ্রবেশ করল। এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন আবদুর রাউফ। তাঁর অভিযোগ, ঠিক যেভাবে অসমে ভোটার তালিকায় মুসলিমদের নামের পাশে ‘ডি’ চিহ্নিত বা সন্দেহজনক ভোটার হিসেবে দেখানো হচ্ছিল, এই রাজ্যেও সেই পথে এগোনোর চেষ্টা চলছে।

এ রাজ্যে নাগরিকপঞ্জি চালু না হলেও ভিন্ন কায়দায় মুসলিম নাগরিকদের বাদ দেওয়ার জন্য বকলমে এক চক্রান্ত চলছে। তার প্রাথমিক ধাপ হিসেবে সুকৌশলে ভোটার তালিকা থেকে মুসলিমদের নাম বাদ দেওয়া হচ্ছে। তাঁর মতে, এটা আরএসএসের মতো সাম্প্রদায়িক সংগঠনগুলির মস্তিষ্কপ্রসূত। প্রকাশ্যে না এসে একেবারে তলে তলে ভোটার তালিকা থেকে মুসলিমদের নাম বাদ দেওয়ার পরিকলনার পেছনে রয়েছে এক বিরাট চক্রান্ত। এর ফলে মুসলিম ভোটার যেমন কমতে থাকবে তেমনি এ রাজ্যে আর একটা অসমের মত পরিস্থিতি তৈরি করতে সহায়ক হবে বলে আবদুর রাউফ মন্তব্য করেন। তাই তিনি সকল নাগরিকদের উদেশ্যে আহব্বান জানান, তারা যেন নিজ নিজ এলাকায় ভোটার তালিকায় নাম আছে কিনা তা নিয়ে সচেতন হোন। তবে, নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলে আবদুর রাউফের পরিবারের সদস্যদের যে নোটিশ পাঠানো হয়েছে তা কারো অভিযোগের ভিত্তিতে নয়। নির্বাচন কমিশনের’ ফিল্ড ইনকোয়ারি’-র ভিত্তিতে ওই নোটিসে বলা হয়েছে,’আপনি এখন দেশের বাসিন্দা নন’। ‘ রেজিস্ট্রেশন অফ ইলেক্টরস রুলস, ১৯৬০ এর ২১এ ধারা মতে কোন ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া হবে না তার জবাব দিতে ১৪ জুলাই হাজির থাকতে হবে। প্রয়োজনীয় তথ্যপ্রমাণ সহ হাজির থাকার কথা বলা হয় আলিপুরের সার্ভে বিল্ডিংয়ে।

এব্যাপারে পুবের কলমকে মুসতাবসেরা রাউফ জানান, তিনি প্রয়োজনীয় তথ্যপ্রমাণ নিয়ে শুনানিতে হাজির হয়েছিলেন। কিন্তু নির্বাচন কর্মীদের কথা শুনে তিনি অবাক হয়ে যান। কিসের ভিত্তিতে তারা বুঝলেন যে কলকাতার যে ঠিকানায় যে তিনি প্রায় ৩৫ বছর ধরে রয়েছেন সেখানে আর থাকেন না, তা নিয়ে অবশ্য ওই সরকারি কর্মীরা রা কাড়েননি। বরং তাকে প্রশ্ন করা হয় জন্ম কোথায় কিংবা পড়াশুনা কোথায় ইত্যাদি ইত্যাদি।

অবশ্য তার সাফ জবাব দেন মুসতাবসেরা রাউফ। অভিজাত ও উচ্চশিক্ষিত পরিবারের মুসতাবসেরা জানান, কলকাতার রিপন স্ট্রিট এলাকায় তাঁর জন্ম। বাবা শাহনওয়াজ ছিলেন ডিউটি ম্যাজিস্ট্রেট । আর দাদু আবদুল গাফফার ছিলেন অবিভক্ত বাংলার ডিস্টিক ম্যাজিস্ট্রেট। প্রখ্যাত ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান লরেটো কলেজ থেকে তিনি স্নাতক। দক্ষিণ কলকাতার মনসুর হাবিবুল্লাহ মেমোরিয়াল স্কুলে ২৮ বছর শিক্ষকতা করার পর তিনি যে অবসর নিয়েছেন সেকথাও জানান। আর ‘চতুরঙ্গ’ সম্পাদক আবদুর রাউফের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার পর ১৯৮৪ সাল থেকেই পার্কসার্কাসের মেহের আলী রোদের বাড়িতে থাকছেন। কোন জাদুবলে নির্বাচন দফতর জানতে পারলো যে তিনি ওই ঠিকানায় থাকেন না বা আর সাধারণ বাসিন্দা নন তা বুঝে উঠতে পারছেন না তিনি। মুসতাবসেরাকে আরও অবাক করে দিয়েছে তাঁর পুত্রকে নিয়ে নির্বাচন কর্মীদের প্রশ্ন। জিজ্ঞেস করা হয় তাঁর পুত্র কত বছর বর্তমান ঠিকানায় থাকতেন না। তখন মুসতাবসেরা বলেন, তাঁর পুত্র আসাদ রাউফ গত পাঁচ বছর ধরে বিদেশে রয়েছেন। এ কথা শোনার পর এক কর্মী উচ্চপদে আসীন এক অফিসারকে বলেন, ভদ্রমহিলার পুত্র গত পাঁচ বছর ধরে এখানে থাকেন না। তাঁর প্রতিবাদ করে মুসতাবসেরা বলেন, পিএইচডি করার জন্যই পাঁচ বছর ধরে তাকে বিদেশে থাকতে হয়েছে। এমনকি সে এখন নেদারল্যান্ডের গ্রোনিনজেন বিশ্ববিদ্যালয়ে ইকনমিক্স ও ফিন্যান্স বিভাগে অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর পদে কর্মরত। আর এনআরআই হিসেবে গত লোকসভা নির্বাচনে ভোটও দিয়ে গেছেন। এরপর ওই অফিসার আশ্বস্ত করেন, তাতে অসুবিধা নেই।

তবে মুসতাবসেরা রাউফ জানিয়েছেন, তাঁর মতো অনেক নাগরিককেই শুনানিতে ডেকে পাঠানো হয়েছে যাদের প্রায় সকলেই মুসলিম সম্প্রদায়ের। আবদুর রাউফের পরিবারের নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলার ঘটনায় আতঙ্কিত করে তুলেছে মুসলিম সমাজকে। তাদেরকে এখন অসমের নাগরিকপঞ্জির ছায়া তাড়া করে বেড়াচ্ছে।

উল্লেখ্য, অসমে নাগরিকপঞ্জি হওয়ার পর থেকে তা নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই। সেখানে প্রায় ৪০ লক্ষ বাঙালির নাম বাদ গেছে, যার মধ্যে সিংহভাগই মুসলিম। বিজেপি শাসিত অসমের পর নিশানা করা হতে পারে পশ্চিমবঙ্গকে, এই আশঙ্কা ছিল। বিজেপি ক্ষমতায় এলে পশ্চিমবঙ্গে এনআরসি হবে রাখঢাক না রেখে এমন হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন শীর্ষ বিজেপি নেতা ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। তার সুরে সুরে মিলিয়ে গলা চড়িয়ে বেড়াচ্ছেন এ রাজ্যের বিজেপি নেতারাও। সেই নাগরিকপঞ্জির উদ্দেশ্যে সফল করতে ইতিমধ্যে তৎপরতা শুরু হয়ে গিয়েছে। তবে সরাসরি নাগরিকপঞ্জি চালু না হলেও প্রাথমিক ভাবে নাগরিক হিসাবে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। যার নিশানা মূলত কিন্তু সংখ্যালঘু মুসলিমরা। এমন অভিযোগের সত্যতা ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

(সৌজন্যে: পুবের কলম। রিপোর্ট: জাইদুল হক)