টিডিএন বাংলা ডেস্ক : সুরাইয়া আকতারের চোখে’র সামনে সবকিছু ধূসর হয়ে ধীরে ধীরে অন্ধকারে ঢেকে যাচ্ছে। কিন্তু তার চোখেমুখে খুশির ঝলক। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী সুরাইয়া যাচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ইলিনিয়ে, পিএইচডি করতে। তাঁর পিএইচডি’র বিষয় ‘প্রতিবন্ধীতা ও নারী’। একই বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিবন্ধীতা ও কর্মসংস্থান বিষয়ে পিএইচডি করতে গেছেন তাঁর স্বামী মিজানুর রহমান। তাঁদের সঙ্গে যাচ্ছে ৪ বছর ৩ মাস বয়সি ছেলে শেহরান সানিম রহমান। এই পরিবার ২৭ জুলাই রাতে রওনা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্যে।

সুরাইয়ার জীবনের গল্পটা অন্যদের থেকে একটু আলাদা। ২০১৫ সালে সুরাইয়া জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শন বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেন। তিনি ছিলেন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী। সেই সূত্রেই পরিচয় হয়েছিল মিজানুর রহমানের সঙ্গে। মিজানুরও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাসে পড়াশুনা করেছেন। পরিবার ও সমাজের নানা প্রতিবন্ধকতা পেছনে ফেলে ২০১২ সালে তিনি সুরাইয়াকে বিয়ে করেন। এখন দু’জন মিলে প্রতিবন্ধীতা নিয়ে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করতে গেলেন যুক্তরাষ্ট্রে। পাঁচ বছর পর দেশে ফিরবেন, এমনই ইচ্ছে।

নীলফামারীর মেয়ে সুরাইয়া। তিনি জন্মগতভাবে রেটিনার সমস্যায় আক্রান্ত। এইচএসসি পর্যন্ত নিজে লিখেই পরীক্ষা দিতে পেরেছেন। কিন্তু তারপর থেকে চোখের সামনে সবকিছু ধূসর হতে থাকে। বর্তমানে সূর্যের আলোতে সামনের জিনিস কিছুটা দেখলেও ঘরের ভিতর আবছা ছাড়া আর কিছুই দেখেন না। চার বোনের মধ্যে তাঁর ছোট বোনেরও একই সমস্যা। দু’বছর আগে ভারতে গিয়ে জানতে পারি, আমার চোখের সমস্যাটা জিনগত। ততদিনে অনেক দেরি হয়েগেছে। সন্তান জন্ম নেওয়ার আগেই বিষয়টি জানা গেলে ভালো হত। কিছু সতর্কমূলক ব্যবস্থা নেওয়া যেত। এখন ছ’বছর বয়স পর্যন্ত সন্তান ঝুঁকির মধ্যে থাকবে বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন।

অস্ত্রপ্রচার করে সন্তান জন্ম দেওয়ার ফলে চোখের অবস্থা দ্রুত খারাপের দিকে চলে যায়। স্নাতক (সম্মান) প্রথম বর্ষে বিয়ে, শেষ বর্ষের পরীক্ষার সময় সন্তানের জন্ম। বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী হিসেবে সুরাইয়াকে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়। এক শিক্ষক তো সরাসরিই বলে দিয়েছিলেন, যেহেতু চোখে দেখে না, তাই পড়াশোনার দরকারটা কি? এই সময় বিভিন্নভাবে পাশে দাঁড়ায় পিডিএফ।

সুরাইয়া বলেন, ‘ আমি বেশকিছু চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করলেও আমার পরে যে শিক্ষার্থীরা এ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে এসেছেন, তাঁদের এ পথ পাড়ি দেওয়া অনেক সহজ হয়ে গেছে।’ চোখের সমস্যা তীব্র থেকে তীব্রতর হলেও সুরাইয়া ঠিকই সামলে চলেছেন সংসার ও সন্তান পালনের দায়িত্ব। রান্নাঘরের সব জিনিস ঠিক জায়গায় রাখলে অনুমান করেই রান্না করেন। পাশ থেকে স্বামী মিজানুর জানালেন, এমনকি ইউটিউব থেকে নতুন নতুন রান্নার রেসিপি অনুযায়ী রান্নাও চলে পুরো দমে। সব কিছুতে স্বামীর সহযোগিতার হাত যে আছে, তা তাঁদের কথাবার্তায়তেই বোঝা যাচ্ছিল।

শুধু সংসার নয়, দেশে সুরাইয়া উইমেন উইথ ডিজঅ্যাবেলিটিস ডেভলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের নির্বাহী সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। স্বামী ও স্ত্রী দেশে ফিরে প্রতিবন্ধীতা বিষয়টি নিয়ে নতুন করে কাজ করবেন বলে জানালেন।