পাঠকের কলম, টিডিএন বাংলা : শিক্ষা মানুষের সব দৈন্যদশা, অভাব-অনটন থেকে মুক্ত করার কথা। অথচ বর্তমান প্রচলিত শিক্ষা আমাদের দিন দিন দৈন্যের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা, পারিবারিক মূল্যবোধ ও সামাজিক সংস্কৃতির একটি বিরাট দুর্বলতা হল শিক্ষা আমাদের কায়িক শ্রম থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। ব্যক্তিজীবনে এবং পারিবারিক পর্যায়ে কায়িক শ্রমের যে কাজগুলো প্রায়ই করার প্রয়োজন পড়ে, সে কাজগুলোও আমরা করতে চাই না বা করতে পারি না। ফলে দেখা যায়, অতি সাধারণ পারিবারিক বা গৃহস্থালি কাজ করার জন্য আমাদের লোকজন ডাকাডাকি করতে হয়।

কোনো কারণে লোকজন না পাওয়া গেলে আমরা অসহায় বোধ করি, কাজটি পড়ে থাকে। ছোটখাটো ব্যবসা বা সেবাজাতীয় কাজ করে কিছু অর্থ উপার্জনের সুযোগ এলে আমরা সে সুযোগ গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকি। কথায় কথায় আমাদের আত্মীয়-স্বজন এবং তাদের সন্তানদের বলতে শুনি, এসব কাজ তাদের নিজস্ব বা পারিবারিক মর্যাদার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। তারা কর্মহীন অবস্থায় পরিবারের ওপর বোঝা হয়ে থাকবে, তবু নিজ উদ্যোগে টুকটাক কিছু কাজ করে পরিবারের জন্য সম্পূরক আয় করবে না।

চাহিদার দিক থেকে শিক্ষিত বেকারদের এ প্রবণতা লক্ষণীয়। তাদের সবচেয়ে পছন্দের কাজ হচ্ছে সরকারি-আধাসরকারি সংস্থায় চাকরি। কারণ হিসেবে তারা মনে করে, এসব চাকরিতে কায়িক শ্রম নেই, খাটাখাটুনি কম, ফাঁকি দেওয়ার পর্যাপ্ত অবকাশ রয়েছে। সবচেয়ে বড় আকর্ষণ এখানে বাড়তি আয়ের (ঘুষ ও অনৈতিক কাজের মাধ্যমে) সুযোগ রয়েছে। আরো একটি আকর্ষণ হচ্ছে, চাকরি শেষে পেনশনের ব্যবস্থা রয়েছে। চাকরিতে ঢোকার বয়সে পেনশন যে কারো জন্য এত বড় আকর্ষণ হতে পারে, তা আমার দীর্ঘদিন জানা ছিল না। অনেক পরে জানতে পেরেছি। কিশোর-তরুণরা বাপ-দাদা, আত্মীয়-স্বজন থেকে শুনে শুনে অতি অল্প বয়সে পেনশনের বিয়ষটি তাদের হিসাবে ঢুকিয়ে নিয়েছে। এখন সবকিছু মিলিয়ে তারা তাদের পছন্দ নির্ধারণ করে। মনে হয় বৈষয়িক ব্যাপারে আমরা একটু বোকা ছিলাম।

বিভিন্ন কারণে কোনো দেশের কর্মক্ষম জনসংখ্যার (১৫ থেকে ৬৫ বছর) একাংশ বেকার থাকে। অর্থনৈতিক বাস্তবতার কারণে দেশে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ কম, সবাইকে কাজে নিয়োগ করার মতো অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড নেই। মন্দার কারণে সাময়িকভাবে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ভাটা দেখা দেয়। সরাসরি উৎপাদনে এবং আনুষঙ্গিক কর্মকাণ্ডে ব্যাপৃত ছিলেন এমন অনেক শ্রমিক-কর্মচারী নির্বাহী ছাঁটাইয়ের আওতায় পড়ে বেকার হয়ে যান।

শিল্প-কারখানা ব্যবসার ক্ষেত্রে নতুন প্রযুক্তি আসার কারণে যে কাঠামোগত পরিবর্তন ঘটে তার কারণে শ্রমিক-কর্মচারীর একাংশ অপ্রয়োজনীয় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে পড়ে। তারাও পর্যায়ক্রমে বেকারের দলে শামিল হয়। কিছু কর্ম ধারাবাহিকভাবে মৌসুমি কর্ম হিসেবে স্বীকৃত। মরসুম শেষ হলে এখানকার শ্রমিক-কর্মচারীরা কর্মক্ষেত্র ছেড়ে অন্যত্র চলে যায়। আগামী মরসুম না আসা পর্যন্ত তাদের অনেকে বেকার থাকে। সবশেষে রয়েছে স্বভাবগত কারণে কর্মহীনের দল।

এরা কোনো কাজ করতে পছন্দ করে না, কর্মক্ষেত্রের শৃঙ্খলা এদের ধাতে সয় না। তাই এরা কর্মহীন থাকে। বাপের হোটেলে খায়; হেসে খেলে, ঘুমিয়ে, আলসেমি করে সময় কাটায়। এদের বেকার হিসেবে গণ্য করা হয় না। এদের বলা যায় Layaboat বা নিষ্কর্মা। আঞ্চলিক ভাষায় বলা হয় ‘বাদাইমা’। এদের ওপর আকর্ষণীয় লেখা রয়েছে। উন্নত দেশেও এ ধরনের লোক রয়েছে। এই তো সেদিন নিউ ইয়র্কের ক্যামিলাস এলাকায় মাইকেল রোতান্ডো নামের এক নিষ্কর্মা যুবককে তার মা-বাবা কোর্টের মাধ্যমে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছেন।

সমস্যাটি কি বেকারত্ব তথা কর্মসংস্থানের সমস্যা, না শিক্ষার গুণগত মানের সমস্যা তা পর্যালোচনার দাবি রাখে। দেশে কর্মসংস্থানের যত অভাব থাকুক না কেন, একজন পিএইচডি ডিগ্রিধারী পিয়নের চাকরির জন্য দরখাস্ত করতে যাবে কেন? পিএইচডি হচ্ছে একাডেমিক জগতের সর্বোচ্চ ডিগ্রি। একজন পিএইচডি ডিগ্রিধারী ব্যক্তি নিজস্ব পারদর্শিতায় একটি গবেষণাকাজ সম্পন্ন করতে পারেন, গবেষণা প্রকল্পে নেতৃত্ব দিতে পারেন।

তিনি জ্ঞানগর্ভ প্রবন্ধ লিখতে পারেন, প্রগাঢ় বিশ্লেষণ করতে পারেন। তাঁর লেখায় বা বক্তব্যে দৃষ্টিকটু ভুল থাকবে না। তাঁর বক্তব্য বিজ্ঞানসম্মত ও যৌক্তিক হবে। বক্তব্যে অভ্যন্তরীণ অসংগতি (Internal Inconsistency) থাকবে না। তাঁর প্রকাশশৈলী গ্রহণযোগ্য মানের হবে। উপরোক্ত গুণে গুণান্বিত একজন পিএইচডি একাডেমিক জগতে কোনো উপার্জনধর্মী কাজ পাবেন না, এমনটি বিশ্বাস করা যায় না। তাঁর মুরব্বি অধ্যাপক বা শুভানুধ্যায়ীরা তাঁকে একটি কাজ জুগিয়ে দেবেন, যা বেতনের দিকে উঁচু স্তরের না হলেও মর্যাদার দিক থেকে খাটো হবে না।

যে পিএইচডি ডিগ্রিধারী পিয়নের চাকরির জন্য আবেদন করেন তাঁর একাডেমিক যোগ্যতা ও মর্যাদাবোধ সম্পর্কে সন্দেহ করার প্রভূত যুক্তি আছে। আজকাল অনেক স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী লোকের দেখা পাওয়া যায়, যারা শুদ্ধ ইংরেজি বা বাংলায় (মাতৃভাষায়) একটি অনুচ্ছেদ লিখতে পারেন না। এক অনুচ্ছেদের মধ্যে বানান ও বাক্য ভুলের সংখ্যা ১০-১২ ছাড়িয়ে যায়। পিএইচডি সার্টিফিকেটধারীর ক্ষেত্রেও এমনটি ঘটা একেবারে বিচিত্র নয়। এঁরা হয়তোবা অতি অখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ের মেশিন থেকে গড়িয়ে পড়া পণ্যসামগ্রী। বিশেষ পদ্ধতি-প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এঁদের সৃষ্টি হয়েছে; তার সঙ্গে জ্ঞান বা পারদর্শিতা অর্জনের কোনো সম্পর্ক নেই।

পিয়ন পদের জন্য এত হাজার হাজার, লাখ লাখ আবেদন পড়লেও আমরা দেখতে পেয়েছি যে হিসাব-নিকাশ, তথ্য-সংগঠন, সৃষ্টিধর্মী কিংবা গবেষণাসংশ্লিষ্ট কাজের জন্য একাধিকবার বিজ্ঞপ্তি দিয়েও পর্যাপ্তসংখ্যক প্রার্থী পাওয়া যায় না। যে কাজে সামান্য কিছু কায়িক শ্রম জড়িত আছে, কর্মস্থলে শৃঙ্খলার বিষয়টি সম্পর্কে প্রার্থীরা জ্ঞাত রয়েছে অথচ (অনৈতিক) বাড়তি আয়ের সুযোগ নেই সে কাজে শিক্ষিত বেকাররা উৎসাহী নয়। বাড়তি আয় না থাকলে, কমপক্ষে এমন বাড়তি সুবিধা থাকতে হবে, যার বৈষয়িক সংশ্লেষ রয়েছে। পরিশৃঙ্খল পরিবেশে খাটাখাটুনি করে সপ্তাহ বা মাসের শেষে শুধু বেতন পাওয়া যাবে এমন কাজে যোগ দিতে শিক্ষিত বেকাররা আগ্রহী নয়। ছাদের নিচে বসে, পড়াশোনা ব্যতিরেকে মাঝেমধ্যে ফাঁকি দিয়ে চলা যায় এবং সঙ্গে কিছু বাড়তি আয়ের সুযোগ আছে এমন কাজের প্রতি রয়েছে তাদের দুর্নিবার আকর্ষণ।

শিক্ষাঙ্গনকে দুর্নীতিমুক্ত, বাস্তবমুখী পারদর্শিতা অর্জনের নিশ্চিত ভূমিতে রূপান্তরিত না করা গেলে এ অবস্থার পরিবর্তন ঘটবে না। উচ্চতর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে শ্রমবাজারের প্রতিস্থাপক হিসেবে না দেখে শিক্ষার চূড়ান্ত মর্যাদাবান পীঠস্থান হিসেবে গড়ে তুলতে হবে, যাতে এসব প্রতিষ্ঠান থেকে পাস করা শিক্ষার্থীরা প্রত্যেকে আলোকবর্তিকা হিসেবে নিজ অঙ্গন উদ্ভাসিত করে চলতে পারে। এদের জন্য ব্যবসা-শিল্প গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় বাস্তবমুখী কার্যকর ‘ইন্টার্নশিপ’ কর্মসূচির ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে ডিগ্রি পাওয়ার পরপরই তারা কর্মস্থলে যোগ দিতে পারে। তখন আর পিএইচডি ডিগ্রিধারীদের পিয়নের চাকরির জন তাঁদের আবেদন করতে হবে না।

দেশে কর্মমুখী শিক্ষার অভাবে বাড়ছে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা। কারিগরি ও বিশেষায়িত শিক্ষায় যোগ্যতা সম্পন্ন ব্যক্তিদের চাকরির বাজারে ভালো চাহিদা আছে। কিন্তু চাহিদানুযায়ী দক্ষ জনবল সরবরাহে আমাদের বিদ্যমান শিক্ষাব্যবস্থা যথোপযুক্ত ভূমিকা রাখতে পারছে না। ফলে আমাদের দেশের শিক্ষিত বেকারগণ ব্যর্থতা ও হতাশায় আক্রান্ত হচ্ছে। অনেক সময় চেষ্টা ও সংগ্রামে বিফল হয়ে ধ্বংসাত্মক কাজে আত্মনিয়োগ করছে, যা কেবল তার নিজের বা পরিবারের জন্য নয়, গোটা সমাজের জন্য হয়ে উঠছে ভয়ঙ্কর। এমতাবস্থায় করণীয় হচ্ছে, এ সমস্যা থেকে উত্তরণের উপায় বের করা।

তাত্ত্বিক জ্ঞানের সাথে ব্যবহারিক জ্ঞানের সমন্বয় সিাধন দরকার। বলা হয়ে থাকে, ‘A good education leads both theory and practice’.কর্মমুখী শিক্ষা থাকলে শিক্ষার্থী প্রাত্যহিক জীবনে ছোটখাট কাজ সম্পাদনে নিজেই সচেষ্ট হতে শেখে এবং বিদ্যালয়, গৃহ, ক্ষেত-খামার, কল-কারখানা ইত্যাদিতে কায়িক শ্রমের দ্বারা উৎপাদনশীল কর্মকান্ডে অংশগ্রহণ করে অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারে। যে শিক্ষা দ্বারা শিক্ষার্থীর দেহ, মন ও বাস্তব কর্মের মধ্যে সমন্বয় ঘটে তাই কর্মমুখী শিক্ষা। দেশ ও জাতির প্রধান সম্পদ হল এর দক্ষ জনশক্তি। পরিকল্পনা ছাড়া জনসাধারণকে দক্ষ শক্তিতে গড়ে তোলা সম্ভব নয়। তাত্ত্বিক জ্ঞানের সাথে ব্যবহারিক জ্ঞানের সমন্বয় সাধনের মাধ্যমেই শিক্ষার যথার্থ রূপান্তর ঘটানো যেতে পারে এবং জনগণকে জনসম্পদে পরিণত করাও সম্ভব হয়। এই দৃষ্টিকোণ থেকে কর্মমুখী শিক্ষার ভূমিকা অনস্বীকার্য। ভুলে গেলে চলবে না যে, ‘Better Skills, Better Jobs, Better Lives’.

বিশ্বের বাণিজ্যিক মোড়ল হিসেবে পরিচিত চীনের শিক্ষাব্যবস্থার কথা সবাই জানেন। যে দেশের মানুষরা এক সময় তাদের মাতৃভাষা গুছিয়ে বলতে পারতেন না তাদের আজ কী অবস্থা। দীর্ঘ ৬৫ বছর চীন মানবসম্পদ উন্নয়নে একতরফাভাবে কারিগরি এবং পৈতৃক পেশাগত কর্মমুখী শিক্ষার উন্নয়নে অর্থ ব্যয় করেছেন। ওই দেশটি পৃথিবীতে অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হওয়ার জন্য দীর্ঘ পাঁচ বছর তাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থী ভর্তি বন্ধ রেখেছিল। তৎকালীন চীন সরকারের ধারণা, এত ছেলেমেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে কী করবে? কোথায় চাকরি পাবে? কে তাদের চাকরি দেবে? ওই সময় থেকেই চীনের ছাত্রছাত্রীদের নানা ধরনের ট্রেড কোর্সে আধুনিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। চীনের প্রতিটি বাড়ি একটি ফ্যাক্টরি, প্রত্যেক পরিবারের প্রতিজন সদস্য এক একজন ইঞ্জিনিয়ার। চীন যেখানে মানবসম্পদ উন্নয়নের কারখানা হিসেবে শিক্ষাকে গ্রহণ করেছে, সেখানে ভারতবর্ষের মতো দেশের সম্ভাবনায় একটি দেশে বেকার তৈরির কারখানা প্রতিনিয়তই গড়ে উঠছে।

কথায় আছে অলস মস্তিষ্কে শয়তানের বাস। বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায় যে বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি নিচ্ছে উপযুক্ত কর্মসংস্থানের অভাবে তাদের একটি বড় অংশ বেকার থেকে যাচ্ছে। কোনো শিক্ষিত ব্যক্তি বেকার থাকতে চায় না। শিক্ষিত তরুণদের বড় আকর্ষণ একটি ভালো সরকারি চাকরি। কিন্তু সরকারি-বেসরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানই তাদের সে স্বপ্ন পূরণ করতে পারছে না। ফলে তাদের মধ্যে এক ধরনের হতাশা লক্ষ্য করা যায় এবং তারা এ কারণেই বিপথগামীও হচ্ছে। আর এ সুযোগটি গ্রহণ করছে সমাজের অপশক্তি। তারা জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবাদে জড়িয়ে পড়ছে। দেশে প্রায় কয়েক কোটি শিক্ষিত বেকার। বেকারত্বের এ পরিসংখ্যান কতটা ভয়াবহ তা সহজে অনুমেয়। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ ঘটাতে হবে। শিক্ষিত তরুণদের জন্য উপযুক্ত কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা গ্রহণ করা খুব কঠিন কাজ নয়।

আবু নাসের আব্দুল হাই ছিদ্দেকী
বছলা, করিমগঞ্জ, আসাম