পাঠকের কলমে, টিডিএন বাংলা: কান্দি থানার এক কুখ্যাত গ্রাম হাটপাড়া। লোকেরা বলে ওটা নাকি ক্রিমিনালদের গ্রাম। ওই গ্রামের তিন ছেলে আর দুই মেয়েকে নিয়ে বাদল সেখ ও জোৎস্না বেগমের সংসার। নিতান্ত গরীব পরিবার। ১৯৯২ সালে ক্রিমিনালদের হাতে খুন হন পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী বাদল সেখ। তারপর থেকেই নিদারুন দুঃখ কষ্টে দিনযাপন করতে থাকে পরিবারটি। এই পরিবারের সব ছোট মুহাম্মদ আরিফ সেখ। মাত্র দু বছর বয়সে সে হারিয়েছে বাবাকে। দুঃসময়ে সংসারের হাল ধরেন মা। ছোট ভাই বোনদের মানুষ করার দায়িত্ব নেন বড় ভাই।

মুর্শিদাবাদের ওই প্রত্যন্ত গ্রামের অতি দরিদ্র পরিবারের এই সন্তানটির ষষ্ঠ শ্রেণী থেকেই পড়াশোনার দায়িত্ব নেয় আল-আমিন মিশন। তারপর ২০০৭ সালে ৭৯৫ (৯৯.৪%) নম্বর পেয়ে আরিফ মাধ্যমিকে রাজ্যে প্রথম স্থান দখল করেন। রাষ্ট্রপতি এপিজে আব্দুল কালামের আত্মজীবনী “উইংস অফ ফায়ার” তাঁর জীবনকে বদলে দিয়েছিল।

সেদিন সে হার না মানা জেদ ধরেছিল। আর এই সাফল্যই বদলে দিয়েছে হাটপাড়া গ্রামের পট। এলাকার সুনাম উদ্ধার করেছিল এই আরিফ ও তার সাফল্য। সেদিনের মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য আরিফকে একটা কলম উপহার দিয়ে বলেছিলেন, “এটা দিয়ে লিখবে”। সেই প্রত্যন্তু গ্রাম হাটপাড়ার আরিফ আজ ডক্টর মুহাম্মদ আরিফ শেখ।
ব্যাপারটা অত সহজ ছিল না, বলা ভালো, কতটা কঠিন, প্রায় অসম্ভব ছিলো, তা বুঝে উঠতে পারা আমাদের মতো দুধেভাতে দের কাছে সহজ নয়।

আরিফের স্বপ্নের উত্তরণ রূপকথার গল্পকে হার মানায়। আরিফ উচ্চমাধ্যমিকেও স্ট্যান্ড করেছিল। ফিজিক্স এ অনার্স নিয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়। সেখান থেকে ইন্টিগ্রেটেড পিএইচডি (বিএসসি’র পরে পিএইচডি, পোষ্ট-বিএসসি) করতে যায় হরিশ্চন্দ্র রিসার্চ ইনস্টিটিউট, এলাহাবাদ, উত্তরপ্রদেশ। মহাকাশবিজ্ঞানে গবেষণা শুরু করে ব্ল্যাকহোল এবং অ্যানালগ গ্রাভিটির ওপরে। প্রধানত সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদ বিষয়ক, মূলতঃ সম্পূর্ণ তাত্ত্বিক কাজ।

আরিফের এককালের বান্ধবী বর্তমানে স্ত্রী ইভলিনা ফেরদৌসী।
মজার ব্যাপার হলো, নিজের ঢাক নিজে পেটানোর এই ‘স্মার্ট’ যুগে, আরিফ একেবারে প্রাচীনপন্থী। নিজের সোশ্যাল মিডিয়ায় কোনো একাউন্টও নেই।

কিন্তু সে উঠে এসেছে। আরিফ উঠে এসেছে। সমস্ত বাধা পেরিয়ে শক্ত পায়ে এক বিশেষ আর্থ-সামাজিক স্তরের প্রতিনিধি হয়ে। আর তাই আমাদের কর্তব্য, সিস্টেমের কর্তব্য, আরিফদের মত প্রতিভাদের উঠে আসতে সবরকম সাহায্য করা। জানি, আরিফরা পরোয়া করে না কারো সাহায্যের, কিন্তু তাও আমাদের কর্তব্য থেকে যায় দেশের প্রতিটি কোনায় কোনায় আরিফ দের চিহ্নিত করে তাদের খুঁজে বের করা। তাদের পাশে দাঁড়ানো। উৎসাহ দেওয়া।

কেননা একমাত্র শিক্ষাই পারে অন্ধকার কাটিয়ে উন্মুক্ত আলোর দিশা দিতে। শতাব্দী প্রাচীন অনেক অন্ধকার জমে রয়েছে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। বর্তমানে সে অন্ধকার আরও গাঢ় হচ্ছে ক্রমশঃ। মানুষের বুদ্ধি ঘুলিয়ে যাচ্ছে। ঘুলিয়ে দিচ্ছে কিছু স্বার্থাণ্বেষী চতুর লোক। একমাত্র শিক্ষাই রুখে দিতে পারে সেই চক্রান্ত। আরিফদের উঠে আসা তাই একান্ত জরুরি। আমাদের দায়িত্ব নিতে হবে আরিফদের খুঁজে বের করার।

অন্যদিকে আরিফদেরও কি দায়িত্ব নেই! আছে। শিকড় দিয়ে মাটি থেকে গাছ শুষে নেয় প্রাণকণা। তাই দিয়ে জীবন ধারণ করে। তারই ফিরিয়ে দেওয়া প্রানসার আবার মেঘ হয়ে বৃষ্টি হয়ে মাটিতেই ফিরে আসে। মাটি সিক্ত হয়। শক্ত হয় শিকড়।

আরিফদের গাছ হয়ে উঠতে হবে। হতে হবে বৃক্ষরাজ। সমাজের যে স্তর থেকে উঠে এসেছে, সেখানে যেন শিকড় অটুট থাকে তাদের। যেন তারা অতীতকে না ভোলে। এটা ভুলে গেলে চলবে না তাদের উঠে আসা সম্পূর্ণ তাঁদের ব্যক্তিগত নয়, বরং সমষ্টিগত। তাই শিকড় বিচ্ছিন্ন হলে চলবে না। ফিরিয়ে দিতে হবে অনেক কিছু। বাকিরা চাতকের মতো চেয়ে আছে। তাদেরকে ফিরিয়ে না দেওয়া শুধু অকৃতজ্ঞতা নয়, কৃতঘ্নতাও বটে।
কংগ্রাচ্যুলেশন্স আরিফ। ওয়ে মোর টু গো…এন্ড মাইলস টু গো…।

শেখ মহাব্বত
টিচার ইন চার্জ,
ঊষাঙ্গিনি কলেজ অফ এডুকেশন ফর উইমেন