কবিতা কৃষ্ণান, টিডিএন বাংলা: গত ৭ ফেব্রুয়ারী, ২০২০ রাজ্যসভায় একটি প্রাইভেট বিল আনা হয়েছে যাতে জোর করে জন্ম নিয়ন্ত্রণের কথা বলা হয়েছে। এটি সংবিধান সংশোধনীও বটে যা বলছে যে দুটির বেশী সন্তান যদি কোনো দম্পতির থাকে তাহলে সংবিধান স্বীকৃত যেসব অধিকার আছে তা থেকে তাঁরা বঞ্চিত হবেন। এটি একটি ভয়ঙ্কর বিল।

একথা ভুলবেন না যে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ মানে মহিলাদের জন্য নিরাপদ জন্ম নিয়ন্ত্রণের সুযোগ তৈরী করা নয় যার মাধ্যমে তাঁরা প্রজননের সিদ্ধান্ত নিজেরা নিতে পারবে। বরং এর মাধ্যমে রাষ্ট্রকে অনুমতি দেওয়া হয় মহিলাদের শরীরকে বাচ্চা পয়দা করার যন্ত্র হিসেবে গণ্য করার এবং সন্তানের জন্ম দেওয়ার জন্যই মহিলাদের ধিক্কার আর শাস্তি দেওয়ার, এমনকি গণ হারে বন্ধ্যাকরণ করার মত গণহিংসা চালানোরও।

গত ২০১৯ সালে স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী “জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ অভিযান”-এর কথা বলেছিলেন যেখানে ছোট পরিবারকে “দেশপ্রেমি পরিবার” হিসেবে তুলে ধরা হবে। ‘বেটি বাঁচাও’ বা ‘স্বচ্ছ ভারত’ অভিযানের মতই এই অভিযানও হবে মানুষের স্বাভাবিক আচরণ পরিবর্তন করার লক্ষ্যে ‘গুঁতো মারা’। মোদি যাকে “অনিয়ন্ত্রিত জন্মহার” বলে অভিহিত
করেছেন তার বিরুদ্ধে রীতিমত প্রচার চালানো হবে। এই প্রচারে মুলত দেখানো হবে যে ছোট পরিবারের বাবা-মায়েরাই আসলে দায়িত্ববান এবং দেশপ্রেমিক। বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, “সন্তানের জন্ম দেওয়ার আগে পিতামাতার ভাবা উচিত তাঁরা সন্তানের সব প্রয়োজন মেটাতে প্রস্তুত কি না। নাকি সমাজের ওপর তা ছেড়ে দিতে চাইছেন?” এ’কথার মানে কি দাঁড়ালো? একটি শিশুর প্রতি রাষ্ট্রের যা যা দায়িত্ব থাকে, যেমন শিক্ষা, স্বাস্থ্য, খাদ্য এবং বাসস্থান–সেই সব কর্তব্য সুচতুরভাবে রাষ্ট্রের দায় থেকে সরিয়ে শিশুটির পিতামাতার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে! এই সমস্ত সুযোগ সুবিধা থেকে যদি কোনও শিশু বঞ্চিত হয় তাহলে কি তার দায় সেই শিশুটির পিতামাতার ওপর বর্তায়?

জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রনের মতাদর্শ সবসময়েই বলতে চায় গরীব মানুষ আর গরীব দেশ যেন কম জন্ম দেয়। কিন্তু সত্যিটা হল দারিদ্রের কারণ কখনোই জনসংখ্যা নয়। বিপুল সম্পদ মোটেই দারিদ্র নিরপেক্ষ নয়। দারিদ্র তৈরি হয় একটা ব্যবস্থার মধ্যে দিয়ে। ধনী মানুষেরা আরও ধনী হয় গরীবদের শোষণ করে। একটা দেশের দারিদ্র সেই দেশটির ঔপনিবেশিক ইতিহাসের সাথে সংযুক্ত, যে শাসনে দেশটিকে লুন্ঠন ও ধ্বংস করা হয়েছিল তার ওপর দেশটির দারিদ্র নির্ভর করে।

দীর্ঘদিন ধরে ভারত সরকার বৈদেশিক পয়সায় পুষ্ট ‘জন্ম নিয়ন্ত্রণ প্রজেক্ট’
চালিয়ে আসছে। তা মূলত গরীব মহিলাদের ওপরেই প্রয়োগ করা হয়েছে। ২০০৯ থেকে ২০১২ র মধ্যে প্রতি মাসে অন্তত ১৫ জন মহিলা মারা গেছেন কোনোমতে জোড়াতালি দিয়ে বন্ধ্যাকরণ করানোর যে প্রক্রিয়া নেওয়া হয় সেইরকম শিবিরগুলোতে। আর এখন এটা বলা হবে যে এর জন্য মহিলারাই দায়ী এবং তাদেরকে সমাজে হেয় করা হবে এবং বেশী সন্তান উৎপাদনের জন্য আঙুল তোলা হবে তাঁদেরই দিকে।

ঠিক যেরকম ভাবে গুজরাট দাঙ্গার সময়ে নরেন্দ্র মোদী বলেছিলেন যে এই ত্রাণ শিবিরগুলো নাকি বাচ্চা জন্ম দেওয়ার জায়গা, এবারের জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ বিলটিরও তেমনই একটি সাম্প্রদায়িক দিক আছে। ২০১৯ সালের ১১ই জুলাই, নরেন্দ্র মোদীর মন্ত্রীসভার অন্যতম সদস্য গিরিরাজ সিং দিল্লিতে ‘আন্তর্জাতিক জনসংখ্যা দিবসে’ একটি জনসভায় বক্তব্য রাখেন। সেই সময়ে একটি গান চলছিল সেই মঞ্চে—“জনসংখ্যার বিস্ফোরণে আমাদের স্বাধীনতার বিপদ, দেশদ্রোহীদের সংখ্যাবৃদ্ধি আমাদের দেশের বিপদ”, এরপর গিরিরাজ সিং বলেন যে, মুসলমানদের জনসংখ্যা কমাতে এবং হিন্দুদের জনসংখ্যা বাড়াতে দ্রুত একটি আইন আনা হোক তাহলেই দেশ বাঁচতে পারে। যারা ওই সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন তাঁরা মুসলমানদের দায়িত্বজ্ঞানহীন এবং দেশদ্রোহী হিসেবে সাব্যস্ত করেন এবং বলেন যে তাঁরা গরীব হয়েও কেন বেশী বাচ্চা নেন? তাঁরা তো জানেন যে সেই
বাচ্চাদের হয় জুতো সেলাই করে বা সাইকেল সারিয়ে খেতে হবে, তাও তাঁরা কেন বেশী বাচ্চা নেওয়ার কথা ভাবেন?

জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের এই অভিযান ‘লাভ জিহাদ’ প্রচারের সাথেও যুক্ত হয়ে
পড়বে যে প্রচারে বলা হয় যে মুসলমানরা নিজেদের জনসংখ্যা বাড়াতে হিন্দু মহিলাদের বিয়ে করে। আসলে মোদীর জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের বিলটি আরও একবার মুসলমানদেরই কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে, তাঁদেরকেই আবার দেশদ্রোহী এবং দায়িত্বজ্ঞানহীন প্রমাণ করার নতুন বাহানা হিসেবে কাজ করবে।
(লেখিকা একজন বামপন্থী নেত্রী)