পাঠকের কলম, টিডিএন বাংলা : রাজ্যের স্কুল গুলির নবম থেকে দ্বাদশ স্তরে শিক্ষক নিয়োগের জন‍্য অপেক্ষা‌মান তালিকাভুক্ত চাকুরী‌প্রার্থীদের অনশন মঞ্চের একজন সক্রিয় সদস‍্য হিসাবে আমি আনোয়ার হোসেন সেখ আমাদের যৌক্তিক দাবির বাস্তব চিত্রটি টিডিএন বাংলার মাধ্যমে তুলে ধরতে চাই-

কলকাতা গ‍্যাজেট (সেপ্টেম্বর, ২০১৬) অনুযায়ী আমাদের মূল দাবি মূলত ২টি- এক. সার্ভিস কমিশনকে অনুপাত(১:১.৪)এর নিয়ম মেনে ফাইনাল প‍্যানেল তৈরি করে স্কুলগুলিতে নিয়োগ করতে হবে।
দুই. ফাইনাল প‍্যানেল প্রকাশের ১৫ দিন আগে পর্যন্ত নবম-দ্বাদশ স্তরে সমস্ত শূন্য পদে শিক্ষক নিয়োগ করতে হবে।

রেশিয়ো(১:১.৪) অনুযায়ী যদি কোনো সংরক্ষণ শ্রেণীতে ১০০টি শূন্য পদ থাকে,তাহলে সেখানে ৪০ জনকে অপেক্ষা‌মান তালিকাতে রাখতে হবে।কিন্তু প‍্যানেলে দেখা যাচ্ছে কোনো সংরক্ষণ শ্রেণীতে ২টো শূন্য পদ অথচ ৮০ জন অপেক্ষা‌মান তালিকা ভুক্ত রয়েছে, আবার কোনো সংরক্ষণ শ্রেণী তে ৪০ টা শূন্য পদ কিন্তু ১২০ বা ততোধিক অপেক্ষা‌মান তালিকাভুক্ত রয়েছে। বিগত বছর গুলিতে নবম-দ্বাদশ স্তরে শিক্ষক নিয়োগ না হ‌ওয়া এবং পর্যাপ্ত পরিমাণে শূন্য পদ থাকা সত্ত্বেও রেশিয়ো মেনে নিয়োগ করতে কমিশনের অনীহা। ফলে যে সমস্ত অপেক্ষা‌মান চাকুরী প্রার্থী রেশিয়ো’র মধ্যে পড়ে তারা হিসেব অনুযায়ী এমপ‍্যানেল্ড হ‌ওয়া সত্ত্বেও আজ অপেক্ষা‌মান তালিকায় পড়ে রয়েছে।তারা তাদের ন‍্যায‍্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে আজ আমরণ অনশনের পথ বেছে নিয়েছে।

বিগত ২০১৩-২০১৪ শিক্ষা‌বর্ষে স্কুল সার্ভিস কমিশন নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পর থেকে ২০১৮ পর্যন্ত যত সংখ্যক শূন‍্যপদ আছে সমস্তটাই বর্তমান চলাকালীন নিয়োগ প্রক্রিয়া‌র সঙ্গে যুক্ত করতে হবে এবং নবম-দ্বাদশ স্তরে সমস্ত অপেক্ষামান তালিকাভুক্ত প্রার্থী‌দের অবিলম্বে চাকুরি সুনিশ্চিত করতে হবে। বর্তমানে যে শূন‍্যপদে কমিশন নিয়োগ করছে সেটি ২০১৪ শিক্ষাবর্ষের উদ্বৃত্ত শূন‍্যপদ। পরবর্তী ৩-৪ বছরের কোনো শূন‍্যপদ যোগ না করাই আমরা আমাদের ন‍্যায‍্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হ‌ওয়ায় আজ আমরণ অনশনে‌র পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়েছি।

কমিশন আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে, নিজের তৈরি গ‍্যাজেট কমিশন নিজেই অমান‍্য করে অসুদপায় অবলম্বন করে শূন‍্যপদের কারচুপি করছে, মৌলিক অধিকার থেকে আমাদের বঞ্চিত করেছে।এর আগে বিগত বছর গুলির নিরিখে পর্যাপ্ত শূন্য পদ সংক্রান্ত বহু ডেপুটেশন আচার্য সদন-বিকাশ ভবন, জেলাভিত্তিক শিক্ষা দপ্তর গুলিতে দেওয়া সত্ত্বেও সেখান থেকে কোনো রকম আশানুরূপ ফল আমরা লাভ করিনি। অপটুডেট শূন‍্যপদ যোগ করা হয়নি। উপরন্তু শূন‍্যপদ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং কমিশন থেকে প্রচার করা হয়েছে উপযুক্ত চাকরিপ্রার্থী পাওয়া যায়নি।

আমরা আমাদের প্রাপ্য অধিকার ফিরে পাওয়ার জন‍্য ২৮ শে ফেব্রুয়ারি গান্ধী‌মূর্ত্তির পাদদেশে অনশনে বসার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। কিন্তু পুলিশী তৎপরতার জন‍্য আমরা ধর্মতলা প্রেস ক্লাবের সামনে আজ টানা ১৪ দিন অভুক্ত ও রাত্রি জাগা অবস্হায় আমরণ অনশন চালিয়ে যাচ্ছি। আমরা প্রত‍্যেকে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ যে আমাদের দাবি না মানা পর্যন্ত আমরা এই স্হান পরিত‍্যাগ করবোনা।

একদিকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ অন্যদিকে সরকারের বৈরী মনোভাব ও বিমাতৃসুলভ আচরণের জন‍্য আমরা আজ হতাশ ও দিশেহারা। বৃষ্টিতে একটা ত্রিপল পর্যন্ত সেখানে টাঙাতে দেয়নি প্রশাসন। এখনও পর্যন্ত ৫০জন অনশন কারী অসুস্হ হয়ে পড়েছে।তাদের এসএসকেএম হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে বলা হচ্ছে- “অনশন করে চাকরি পাওয়া যায়না”। আমাদের অনশন মঞ্চে অনেক গর্ভবতী দিদি-বোন, আদিবাসী সম্প্রদায়ের ছেলে-মেয়েরাও এসেছে‌ন। সুদূর উত্তরবঙ্গ, বীরভূম, বাঁকুড়া, পুরুলিয়া ইত‍্যাদি জেলা থেকেও এসেছেন অনেকেই।

এই অভুক্ত, রোগাক্রান্ত অবস্হায় আর কতদিন চলতে থাকলে সরকার আমাদের দাবি মানবে! আমাদের প্রাপ‍্য অধিকার আমাদের কবে ফিরিয়ে দেওয়া হবে?এমএ, বিএড পাশ করে শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় দক্ষতার সাথে সফল হয়েও আমরা সমাজে মুখ দেখাতে পারছিনা। পারছিনা মাথা তুলে দাঁড়াতে। বৃদ্ধ বাবা-মায়ের ভরসা হতে পারছিনা। বাবা-মার চোখের জল সহ‍্য করবো?

একদিকে বেকারত্বের যন্ত্রণা বুকে বহন করে নেওয়া সত্ত্বেও অপরদিকে আমাদের উপর ‘রাজনৈতিক তকমা’ সাঁটার চেস্টা হচ্ছে। বলা হচ্ছে, আমরা নাকি “অকৃতকার্য”। এই “অকৃতকার্য” কথার মানে টা কী? প‍্যানেলের কোথায় লেখা আছে আমরা “অকৃতকার্য”? আমরা প্রত‍্যেকেই প‍্যানেলভুক্ত চাকুরী প্রার্থী। আমাদের প্রশ্ন আপনারা রেশিয়ো মেনে, বিগত বছর গুলির শূন‍্যপদ গুলি যোগ করে নিয়োগ না করে মন্তব্য করছেন কেন? জনদরদী দিদি নারীদিবসে ধর্মতলায় নিজ মঞ্চে বক্তব্য রাখতে এলেন, অথচ পাশেই অনশনকারী দিদি-বোনদের সাথে একটা একবারও দেখা করার প্রয়োজন মনে করলেন না! এতে আমরা ব্যথিত।

১৪ দিন ধরে শুধুমাত্র নিজেদের অধিকার, শিক্ষকতা করার স্বপ্নকে আঁকড়ে ধরে আমরা মাটি কামড়ে বাড়ি ছেড়ে পড়ে আছি খোলা আকাশের নিচে। ঘরে ফেরার মুখ নেই। কি জবাব দেব বাবা-মা, প্রতিবেশি ও সমাজের কাছে? বর্তমানে আমরা শারীরিক-মানসিক দিক থেকে পঙ্গু হ‌ওয়ার উপক্রম। অনশন মঞ্চের পক্ষ থেকে আমাদের কাতর আর্তি, মমতাময়ী দিদি আমাদের বাঁচান! বেকারত্বের এই অসহ‍্য নরক যন্ত্রণা যে আর সইতে পারছি না!

আনোয়ার হোসেন সেখ
সদস্য,
এসএসসি ছাত্র-যুব অধিকার মঞ্চ