পাঠকের কলম, টিডিএন বাংলা : স্বাধীনতার সাত দশক পরেও আমাদের গর্বের দেশ জাতপাত, সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ, হানাহানি, বিচ্ছিন্নতার বিষবাষ্পে বিপন্ন। বর্তমানে আমাদের দেশ এক দুঃসময়ের মধ্য দিয়ে চলছে। জাতীয় জীবনে সাম্প্রদায়িকতার বিপদ, দেশের প্রগতির পক্ষে বড় চ্যালেঞ্জ হিসাবে দেখা দিচ্ছে। জাতি ও দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে যে কোনো মূল্যে এই চ্যলেঞ্জের মোকাবিলা করতে হবে।বর্তমানে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাহাঙ্গামা এমন হিংস্ররূপ ধারণ করেছে এবং নগ্নভাবে মানবিক মূল্যবোধ ধ্বংস করতে উদ্যত হয়েছে যে, তা চিন্তা করলে শিহরিত হতে হয়। সমগ্র দেশ আজ বিচ্ছিন্নতা ও সাম্প্রদায়িকতার আগ্রাসের মধ্যে অক্টোপাসের মতো জড়িয়ে গেছে।

ব্রিটিশদের গোলামীর বিরুদ্ধে লড়াই করার সময়, এদেশের মানুষ প্রথম একটি জাতি হিসাবে সংগ্রাম করেছিল। তাই স্যার সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছিলেন, “India is a nation in the making. ” অর্থাৎ, “এই প্রথম ভারতের জাতীয়ত্ব প্রতিষ্ঠিত হতে চলেছে।” কিন্তু স্বাধীনতা লাভের সময় থেকেই বিভিন্ন প্রাদেশিকবাদ মানসিকতার প্রকাশ হতে থাকে। পরবর্তীকালে এই জাতিগত সমস্যা জটিল আকার ধারণ করে। পঞ্চাশের দশকে তীব্র আন্দোলনের পর ভাষাভিত্তিক রাজ্য গঠিত হলেও, সমস্যার সমাধান হয়নি।ফলে আজ পর্যন্ত ভারতে অখণ্ড জাতীয় চেতনার বিকাশ ঘটেনি।
দেশের এই সংকটময় অবস্থায় তিনটি ক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তনসাধনই একমাত্র মুক্তির পথ।

» শিক্ষাব্যবস্থা :- ভারতবর্ষের শিক্ষার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, যুগে যুগে নতুন নতুন ভাবাদর্শ শিক্ষানীতিকে প্রভাবিত করেছে।প্রাচীন ভারতের তপোবন থেকে এই শিক্ষার শুরু। মোগল ও ইংরেজ আমল এই শিক্ষাধারায় নতুন স্রোত ও বেগ সঞ্চারিত করেছে। ভিন্ন ভিন্ন সুপারিশ শিক্ষাধারাকে নতুন নতুন পথে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছে। কিন্তু প্রকৃত শিক্ষার উদ্দেশ্যকে ব্যাহত করছে রাজনীতি ও গোষ্ঠী স্বার্থ। তাই স্বাধীন ভারতের শিক্ষাব্যবস্থায় রয়েছে অনেক অপূর্ণতা, গতানুগতিকতা ও সংকীর্ণতা। আজকের পাঠ্যক্রমে গৈরিকীকরণের প্রভাব বর্তমান।
কেউ কেউ আবার বিজ্ঞানের প্রমাণপত্র ঢিঙিয়ে গোরু, গোবরে, গো-মুত্রে দুনিয়ার সকল কল্যাণ দেখতে পায়। তারা ইঞ্জিনিয়ার, ডাক্তারির পাঠ রামায়ণে খোঁজ করতে সাধারণ মানুষকে উদ্বুদ্ধ করে। আজ ইতিহাস বিকৃত হয়ে উপস্থাপিত হচ্ছে।

পাঠ্যপুস্তকে মহামানব হযরত মহম্মদ (সাঃ)-এর ছবি দেওয়া নিয়ে তীব্র সমালোচিত হয় এক প্রকাশনী। পরে ক্ষমাও চেয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে কে বা কারা এইসব উস্কানিমূলক কাজে ইন্ধন যোগাচ্ছে? পাঠ্যক্রম নিয়ে রাজনীতি করা ন্যাকারজনক কান্ড। বিগত দশক গুলোতে আমরা বইয়ে রাম-শ্যাম-যদু দেখতেই অভ্যস্ত। এখন শুধুমাত্র গদির জন্য, রামের জায়গায় রহিম দেওয়া হলে বিদ্বেষীরা বলে তোষণ! পেটে খেতে না পাওয়া রহিমও মনে মনে বেশ খুশি, বইয়ে ছাপা হয়ে। বেলাশেষে গদির লোক হাসে, কারণ সে জানে এ তোষণে লাভের লাভ কেবল তারই!

নীতি শিক্ষাহীন বর্তমান পাঠ্যক্রম আমাদের চরিত্রহীন, স্বার্থপরতা ও অজ্ঞানতার পথে ঠেলে দিচ্ছে ক্রমশ। আমাদের সাম্প্রদায়িক করে তুলছে। হিংসা-বিদ্বেষ আজ প্রতি পৃষ্ঠায়! তাই পাঠ্যক্রমের আমূল পরিবর্তন করে মানব সমাজের জন্য কল্যাণকর, নৈতিকমূল্যবোধ ভিত্তিক পাঠ্যসূচীর প্রচলন বাড়াতে হবে। আমাদের শিক্ষার লক্ষ্য হবে মানব কল্যাণ-মানবতা-সম্প্রীতি। আমাদের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হবে বাঁচার শিক্ষা, সহযোগিতার শিক্ষা। প্রকৃত শিক্ষা হবে সেটা, যে শিক্ষা আমাদের কোটি কোটি প্রাণকে একসূত্রে বাঁধতে শেখাবে। এবং শুধু পাঠ্যক্রম পরিবর্তন করে দিলেই দায়িত্ব শেষ হবে না। তা সংরক্ষণের জন্য উপযুক্ত কিছু ব্যবস্থাও গ্রহণ করা যেতে পারে-

ক) অভিজাত তান্ত্রিক ও জনবিরোধী শিক্ষানীতির পরিবর্তে শিক্ষায় নতুন রূপরেখা তৈরী করতে হবে।

খ) জাতীয় স্তরে ‘শিক্ষা বিষয়ক কর্মশালা’ গঠন করতে হবে।

গ) প্রাথমিক থেকে উচ্চস্তর পর্যন্ত শিক্ষার পাঠ্যসূচীর পরিবর্তন করতে হবে।

ঘ) বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গীর ভিত্তিতে পাঠ্যসূচী গড়তে হবে।

ঙ) পাঠ্যক্রমে সাম্প্রদায়িকতা মুক্ত ইতিহাস পড়াবার ব্যবস্থা করতে হবে।

চ) দেশে সার্বজনীন শিক্ষা ব্যবস্থার প্রসার ঘটাতে হবে।

ছ) সারাদেশে একরকম জাতীয় শিক্ষাক্রম থাকবে, এবং তা রক্ষার জন্য আইন সঙ্গত কাঠামো গঠন করতে হবে।

নানা কারণে আজকের শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয় সংহতি রক্ষায় ব্যর্থ হচ্ছে। সংবিধানে সবাইকে শিক্ষার অধিকার দিলেও সে সুযোগ সবাই পাচ্ছে না।ফলে অসন্তোষ ও বিক্ষোভ দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে। এরমধ্যে সংখ্যালঘুরা আরও পিছিয়ে। মুর্শিদাবাদ জেলায় একটাও বিশ্ববিদ্যালয় নেই। দীর্ঘ আন্দোলনের পরে শুধুমাত্র আশ্বাস দেওয়া হয়েছে, কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি আজ অব্দি। তাই, উপরিউক্ত ব্যবস্থাদি গ্রহণের মাধ্যমে শিক্ষাব্যবস্থার দূর্নীতি দূর করতে হবে।

» সমাজব্যবস্থা :- শিক্ষা মানুষের মাঝে চেতনার উন্মেষ ঘটায়। তাই যদি আপনি সঠিক, কাম্য শিক্ষায় শিক্ষিত হোন তবে সুষ্ঠ সমাজ গঠনে আপনার ভূমিকা সর্বাধিক। ভ্রান্ত- হিংসাত্মক শিক্ষা কখনো সমাজ ও মানুষের কল্যাণ করতে পারেনা।তাই শিক্ষাব্যবস্থার পাশাপাশি, সমাজ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের প্রয়োজন। সমাজ থেকে মদ-সুদ-ঘুষ-ব্যাভিচার, বিদ্বেষ সবরকম নৈতিক অবক্ষয়ের কারণগুলোর শিকড় উপড়ে ফেলতে হবে। আজকের ভারতে একশ্রেণী গো-রক্ষা, লাভ-জিহাদ, ঘর-ওয়াপাসি বিভিন্ন নিত্যনতুন মানুষ খুনের অভিযান চালিয়ে সমাজে অসহিষ্ণুতা আর উত্তপ্ত পরিবেশ সৃষ্টি করছে।

আখলাক থেকে জুনাইদ, আফরাজুল-আসিফা, নাজীব -পেহলু, কুলবার্গী-পানশারে, গৌরী-রোহিতদের হত্যা করে তারা সাম্প্রদায়িকতার বিষ ছড়াচ্ছে চারিদিকে। অবিলম্বে এদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এবং এইসব কাজে সামাজিক সহ, রাজনৈতিক সংগঠন গুলোকে উল্লেখ্যযোগ্য ভাবে এগিয়ে আসতে হবে। খুশির খবর, দেশের এই বিপদজনক অবস্থায় দেশের কিছু ছাত্র সংগঠনের ভূমিকা প্রশংসনীয়। ছাত্র নেতা উমর খালিদ, কানাইয়া কুমার, নাহাস মালা, আবু বকর প্রমুখ অতিপরিচিত মুখগুলি আজকের যুব সমাজের কাছে আশার আলো হিসেবে উদিত হয়েছে। সমাজ পুনর্গঠনের জন্য কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা যায়-

ক) পদযাত্রা :- সাম্প্রদায়িকতা সহ দেশে বর্তমান সকল সমস্যাগুলোকে সামনে রেখে প্রতিবাদ পদযাত্রা করতে হবে। দেশাত্মবোধ-সম্প্রীতির কবিতা, গান, আবৃত্তির মাধ্যমে পদযাত্রাকে আকর্ষণীয় করে তুলতে হবে।

খ) রক্তদান শিবির :- দাঙ্গায় ক্ষতিগ্রস্ত, অসহায় পরিবারগুলোকে সাহায্য করতে রক্তদান শিবির খুলতে হবে।

গ) সম্প্রীতি রক্ষায় অনশন :- দেশের মানুষদের মাঝে সংহতি ও সৌভ্রাতৃত্ববোধ ফিরিয়ে আনতে ছাত্র-ছাত্রীদের অনশন করতে হবে।

ঘ) প্রতিবাদ সভা:- ধর্মের নামে মানুষে মানুষে যে বিভেদ বাধানোর অপচেষ্টা চলছে, তার প্রতিবাদে ছাত্রযুব সমাজকে সোচ্চার হতে হবে। বিভিন্ন সভা-সমিতির মধ্য দিয়ে তারা প্রতিবাদ করবে।

ঙ) আলোচনা সভা:- ঈদ মিলনী উৎসবে, বিভিন্ন পূজা, ক্রিসমাস ইত্যাদি ধর্মীয় অনুষ্ঠান গুলোকে সামনে রেখে সম্প্রীতি ও সমন্বয় সম্পর্কে আলোচনা করা যেতে পারে।

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষার্থে সকল শ্রেনীর মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে।ভালোবাসার শক্তি দিয়ে ঘৃণার শক্তিকে পরাজিত করতে হবে। আজ বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্যের প্রশ্ন বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করছে। তাই এক্ষুনি দেশের ঐক্যকে প্রতিষ্ঠিত করার উপর গুরুত্ব আরোপ করতে হবে।

» রাষ্ট্রব্যবস্থা :- সামাজিক ব্যাধি নিষ্কাশনে সামাজিক সংগঠন গুলোর ভূমিকা সর্বাপেক্ষা গ্রহণীয়। তেমনি সুস্থ শিক্ষা, সুষ্ঠ সমাজ পরিচালনার জন্য চাই সামঞ্জস্যপূর্ণ রাষ্ট্রব্যবস্থা, যা রাজনৈতিক দলগুলো পরিচালনা করবে। সব রাজনৈতিক দলের গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় প্রশ্নে সমঝোতাই জাতীয় ঐক্য, রাজনৈতিক স্থায়িত্ব, সামাজিক সমতা সুনিশ্চিত করবে এবং দেশের ধর্ম নিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক কাঠামো রক্ষা করতে সক্ষম হবে, যা আজকে হুমকির মুখে।বর্তমানে দেশ গেরুয়া বাহিনীর দাপটে অস্থির। সবরকমের অসহিষ্ণু, সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ, প্রতিহিংসা ঝেড়ে ফেলার জন্য কিছু পদক্ষেপ নেওয়া আব্যশিক হয়ে উঠেছে-

ক) অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় বিষয় আছে, যেগুলো নিয়ে পারস্পারিক আলোচনা ও সহযোগিতার প্রয়োজন।

খ) বিরোধী দলকে যথাসাধ্য সম্মান দিতে হবে। রাজনৈতিক মুনাফা লুটের লোভ সামলাতে হবে।

গ) বিরোধীদের সম্পর্কে মিথ্যা বানানো কথা বলা উচিৎ নয়। নেতাদের চরম প্রতিহিংসামূলক, প্ররোচণামূলক, দায়িত্বজ্ঞানহীন উক্তি করা বন্ধ করতে হবে।

ঘ) পূর্বের কোন বক্তব্য ভুল হলে তা স্বীকার করে নেওয়ার মনোভাব গড়ে তুলতে হবে। সিদ্ধান্ত ভুল হলে সংশোধন করতে হবে।

ঙ) কোন রাজনৈতিক দলের কর্মী যেন নিজের হাতে আইন না তুলে নেন।
বিরোধীদের উপর হামলা, রাহাজানি, লুঠতরাজ ও অগ্নিসংযোগ প্রভৃতি অপকর্ম থেকে বিরত থাকতে হবে।

চ) সর্বস্তরের শ্রমিক, কৃষক, কর্মচারী ও শিক্ষকদের পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য সংগঠিত জনমত গড়তে হবে।

ছ)জেলায় জেলায় অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে মিছিল, মিটিং, সমাবেশ করতে হবে।

জ) যারা দেশপ্রেম ও গণতন্ত্রে বিশ্বাস করেন, তাদেরকে এই সঙ্কটময় পরিস্থিতিতে দলমত নির্বিশেষে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।

ঝ) দূরদর্শন গুলোকে দূর্নীতিমুক্ত হতে হবে। বেশি বেশি শান্তি, সম্প্রীতির, সংহতির প্রচার করতে হবে।

দেশ থেকে এই তীব্র হিংসা-বিদ্বেষ, খুন, রাহাজানি রুখতে শিক্ষা, সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনা ব্যবস্থাদির পরিবর্তন সাধনের জন্য শিক্ষিত, ধর্মনিরপেক্ষ, দেশপ্রেমীদের এগিয়ে আসতে হবে। যারা হিংসার পরিবেশ সৃষ্টি করে ভারতকে টুকরো টুকরো করতে চাইছে, তাদের পরাহত করতে শুভবুদ্ধি সম্পন্ন ব্যক্তিবর্গকে অগ্রণী ভূমিকা নিতে হবে। আগামীতে সম্প্রীতির ভারত গড়তে জাতি-ধর্ম- বর্ণ নির্বিশেষে সবাই একত্রিত হওয়া অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়েছে।

মাহ্ফুজা তারান্নুম
নন্দকুমার
পূর্ব মেদিনীপুর