সুরাইয়া খাতুন, টিডিএন বাংলা :  বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে স্কুল, কলেজ সহ কর্মক্ষেত্রে হিজাব বা বোরখা পরা মেয়েদের নানা হেনস্থার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। বিভিন্ন দেশে যেমন কানাডা, আমেরিকা, চীন প্রভৃতি দেশে একে একে হিজাব ও নিকাব নিষিদ্ধ হচ্ছে। কখনো স্কুলে হিজাব পরে আসায় পড়ুয়াকে কটুক্তি শুনতে হয় শিক্ষিকার কাছ থেকে, আবার কখনো কখনো মুসলিম ছাত্রীকে স্কুলে হিজাব না পরে আসার নির্দেশ দেয় স্কুল কর্তৃপক্ষ। এসব প্রায়ই খবরের শিরোনামে উঠে আসে।

সম্প্রতি জানা যায়, উত্তরপ্রদেশে এক হিজাব পরিহিতা শিক্ষিকা ফাতিমা হাসান চাকরি ছাড়তে বাধ্য হলেন। গত এক বছর থেকে তিনি ওই স্কুলে ইংরেজি শিক্ষিকা হিসেবে কর্মরত ছিলেন। কিন্তু এখন স্কুল কর্তৃপক্ষ হিজাব খোলার নতুবা স্কুল থেকে ইস্তফা দেওয়ার নির্দেশ দেয়।

কখনো কখনো কটাক্ষ করা হয়, প্রাচীনপন্থী, প্রগতিবিরোধী বলা হয়। আমার প্রশ্ন হচ্ছে, হিজাব কিভাবে প্রগতিশীলতার পরিপন্থী হয়? হিজাব বিরোধিতাই কি প্রগতিশীলতার মাপকাঠি? প্রগতিশীলতা মানে উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাপন, শরীর দেখানো নয়। ইসলাম বিরোধিতাই প্রগতিশীলতা নয়।

একজন প্রগতিশীল মানুষ সৃষ্টিশীল কাজ করে। ঘৃণা, অসহিষ্ণুতা, ধর্মবিদ্বেষ কিংবা ধর্মান্ধতা – এ সবগুলোই প্রগতিবিরোধী ও অমানবিক। কোনো ধর্ম, গোষ্ঠী, গোত্র বা বর্ণের প্রতি ঘৃণা ছড়ানো বা তাদের আঘাত করা অপরাধ।

ইসলামে বলা হয় দামি-দৃষ্টিনন্দন পোশাক নয় ; শালীন পোশাক, বোরখা, পর্দা বা হিজাবে আছে নারীর সৌন্দর্য। যারা বোরখা বা হিজাবকে প্রগতিশীলতার পরিপন্থী ভাবেন, তাদের স্মরণে রাখা উচিত যে, প্রগতিশীলতা, উদারতা, আধুনিকতা পোষাকে আবদ্ধ নয়। একজন মুসলিম নারীর হিজাব কখনই তার শিক্ষায়, কেরিয়ারের, তার মুক্ত ও স্বাধীন চিন্তা-ভাবনার পথরোধ করে দাঁড়ায় না। যদি তাই হতো, তবে হিজাবধারী নারী আজ রাষ্ট্রপ্রধান হতে পারতেন না, পাইলট হতে পারতেন না, আমেরিকার ১৮১ বছরের প্রথা ভেঙে স্কার্ফ পরেই মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদে নির্বাচিত হতে পারতেন না ইলহান ওমর।

তাই বলা যায়, হিজাব কখনই প্রগতিশীলতার পরিপন্থী নয়। হিজাব হলো নিরাপত্তা। এ প্রসঙ্গে বলি আর এক ফাতিমার কথা, যিনি হিজাবের জন্য কানাডার সংসদের বিরুদ্ধে প্রায় একাই লড়ে বিজয়ী হন। কানাডাতেও কয়েকমাস আগে প্রকাশ্যে নিকাব নিষিদ্ধ করে একটা আইন পাস হয়। যার নাম বিল-৬২। এর আইন অনুযায়ী কানাডায় প্রকাশ্যে কেউ নিকাব পড়তে পারবে না। তিনি তাঁর এক শুভাকাঙ্ক্ষীকে সাথে নিয়ে কানাডার আদালতে রিট করেন। আইনি লড়াইয়ের সাথে চলতে থাকে বিল-৬২ এর বিপক্ষে জনমত গঠন।

লক্ষ্য পূরণের জন্য ফাতিমা তাঁর কয়েকজন মুসলিম বান্ধবীকে নিয়ে প্রতিকূল পরিবেশে অনেক বাধা ও উসকানি সহ্য করেও নিকাব পরেই তাঁর সব কার্যক্রম চালাতে থাকেন। কানাডার প্রথম সারির টিভি চ্যানেলগুলিতে সাক্ষাৎকার দিয়ে জনমত গঠনে বড় ভূমিকা পালন করে।

আমরা উত্তর প্রদেশের ফাতিমা হবো না, যে হিজাবকে বেছে নিয়ে (অবশ্যই প্রশংনীয়) নিজের অধিকার ছেড়ে দেয়। আমাদের সেই কানাডীয় ফাতিমার তেজ ধারণ করতে হবে। যাতে আমাদের পোশাক পরিধান করার স্বাধীনতা থাকবে, সেই সাথে নিজের অধিকার থেকে সরে দাঁড়াবো না। আর সবশেষে বলি, প্রকাশ্যে সব ধরনের বিদ্বেষের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোই আজকের প্রগতিশীল মানুষের নৈতিক কর্তব্য।