স‌ত্যিই কি ব‌ঙ্কিমচন্দ্র মুস‌লিম বি‌দ্বেষী ছি‌লেন না?

0

পাঠকের কলম, টিডিএন বাংলা : সম্প্র‌তি বিজে‌পি ব‌ঙ্কিমচন্দ্র‌কে অসাম্প্রদা‌য়িক প্রমানের অাপ্রান চেষ্টা চালা‌চ্ছে। ব‌ঙ্কি‌মের লেখার ছ‌ত্রে ছ‌ত্রে মুস‌লিম বি‌দ্বেষ ফু‌টে উঠ‌লেও জ‌নৈক লে‌খিকা নতুন ক‌রে প্রমা‌নের চেষ্টা চালি‌য়ে‌ছেন যে অাস‌লে ব‌ঙ্কিম না‌কি মুস‌লিম বি‌দ্বেষী ছি‌লেন না। এর জন্য তি‌নি ব‌ঙ্কি‌মের ‌লেখার কিছু উদ্ধৃ‌তিও দি‌য়ে‌ছেন। সেই উদ্ধৃ‌তি গু‌লো ব‌ঙ্কি‌ম চ‌ন্দ্রের নয় তা বল‌ছিনা। বলার বিষয় এটাই যে কোন গুন্ডা মাস্তান ‌খু‌নি য‌দি দানধ্যান সহ কিছু ভাল কাজ ক‌রেও তা স‌ত্বেও এটা অস্বীকার করা যায় না যে অাস‌লেই লোক‌টি গুন্ডা মাস্তান কিংবা খুনী। তেমনই ব‌ঙ্কিম চ‌ন্দ্রের কিছু ভাল উদ্ধৃ‌তি দি‌য়ে তাকে অসাম্প্রদা‌য়িক প্রমা‌নের চেষ্টা গুন্ডা মাস্তান‌কে দানবীর প্র‌মানের সমতুল।

এছাড়াও তি‌নি রবীন্দ্রনা‌থের ‘অামার সোনার বাংলা’ গা‌নের সা‌থে ‘ব‌ন্দ‌েমাতরম’ কে তুলনা ক‌রে ব‌ন্দেমাতরম গানকে উৎকৃষ্ট হালাল প্রমা‌নের চেষ্টা ক‌রে‌ছেন। তি‌নি অা‌ক্ষেপ ক‌রে‌ছেন মুস‌লিমরা কেন ব‌ন্দেমাতরম গাইবে না! কিন্তু ভাববার বিষয় এটাই যে কতটা অ‌যৌ‌ক্তিক লেখা হ‌লে ত‌বেই ব‌ঙ্কিম‌কে অসাম্প্রদা‌য়িক ও মুস‌লিম হি‌তৈষী প্রমা‌নের জন্য মুস‌লিম‌দের ব‌ন্দেমাতরম না গাই‌তে চাওয়ার রেফা‌রেন্স টান‌তে হয়! এখন সব মুস‌লিম য‌দি ব‌ন্দেমাতরম গে‌য়েই ফে‌লে তা‌তে ব‌ঙ্কিম এর বক্রতা স‌রে গি‌য়ে সরল‌রেখার জন্ম‌ দে‌বে না‌কি? তা‌তে কোন ভা‌বেই প্রমান হয় না যে ব‌ঙ্কিম মুস‌লিম বি‌দ্বেষী ছি‌লেন না।

যাই হোক ব‌ঙ্কিমচন্দ্র কতটা উগ্র প্রকৃ‌তির মুস‌লিম বি‌দ্ব‌েষী ছি‌লেন তা প্রমা‌নের জন্য অামরা কারও লেখা বা ত‌থ্যের উপর নির্ভর ক‌রবোনা। এ ক্ষে‌ত্রে ব‌ঙ্কি‌মবাবুর নি‌জের লেখাই য‌থেষ্ট। ব‌ঙ্কিমচন্দ্র তার বি‌ভিন্ন উপন্যা‌সে তার বু‌কের ম‌ধ্যে জ‌মে থাকা মুস‌লিম বি‌দ্ব‌েষ উদগীরন ক‌রে‌ছেন। সেগু‌লো নি‌ম্নে উল্লেখ করা হল –

১) “সেই এক রাত্রের মধ্যে গ্রামে গ্রামে নগরে নগরে মহাকোলাহল পড়িয়া গেল। সকলে বলিল, “মুসলমান পরাভূত হইয়াছে, দেশ আবার হিন্দুর হইয়াছে। সকলে একবার মুক্তকণ্ঠে হরি হরি বল।” গ্রাম্য লোকেরা মুসলমান দেখিলেই তাড়াইয়া মারিতে যায়। কেহ কেহ সেই রাত্রে দলবদ্ধ হইয়া মুসলমানদিগের পাড়ায় গিয়া তাহাদের ঘরে আগুন দিয়া সর্বস্ব লুঠিয়া লইতে লাগিল। অনেক যবন নিহত হইল, অনেক মুসলমান দাড়ি ফেলিয়া গায়ে মৃত্তিকা মাখিয়া হরিনাম করিতে আরম্ভ করিল, জিজ্ঞাসা করিলে বলিতে লাগিল, “মুই হেঁদু ”

……”দলে দলে ত্রস্ত মুসলমানেরা নগরাভিমুখে ধাবিত হইল।…..সমস্ত লোক সমস্ত রাত্রি জাগরণ করিয়া কি হয় কি হয় চিন্তা করিতে লাগিল। …..মুসলমানেরা বলিতে লাগিল, “আল্লা আকবর! এত‍না রোজের পর কোরাণসরিফ বেবাক কি ঝুঁটো হলো ; মোরা যে পাঁচু ওয়াক্ত নমাজ করি, তা এই তেলককাটা হেঁদুর দল ফতে করতে নারলাম। দুনিয়া সব ফাঁকি।”
[আনন্দমঠ, চতুর্থ খণ্ড, প্রথম পরিচ্ছেদ, ৭৯]।

উপন্যাসের এই অংশে মুসলমানদের কে যবন বলে গালাগালি করা ছাড়াও “মুই হেঁদু ” অশ্লীল শব্দ ব্যবহার করে হাস্যকর বস্তুতে পরিণত করার পাশাপাশি পবিত্র কুরআন শরীফকে নিয়েও হাস্য করা বাদ দেয়নি !? যেমন “আল্লা আকবর!

২) “তখন বড় কোলাহল হইতে লাগিল। কেহ চীৎকার করিতে লাগিল, “মার, মার, নেড়ে মার।” কেহ বলিল, “জয় জয়! মহারাজকি জয়।” ….কেহ গায়িল, “বন্দে মাতরম্!” ….কেহ বলে, “ভাই, এমন দিন কি হইবে, মসজিদ ভাঙ্গিয়া রাধামাধবের মন্দির গড়িব?” [ আনন্দমঠ, তৃতীয় খণ্ড, অষ্টম পরিচ্ছেদ, ৬৯]।

উপন্যাসের এই অংশে নেড়ে মার বলতে মুসলমানদের হত্যা করার কথা বুঝিয়েছেন। মসজিদ ভেঙ্গে রাধামাধবের মন্দির প্রতিষ্ঠার প্রবল আক্রমণাক্ত ইচ্ছে ব্যক্ত ক‌রে চরম পরধর্ম বি‌দ্বেষীর প্রমান দি‌য়ে‌ছেন।

৩) “ইংরেজ রাজা না হইলে সনাতনধর্মের পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা নাই। ….মনোযোগ দিয়া শুন। তেত্রিশ কোটি দেবতার পূজা সনাতনধর্ম নহে, সে একটা লৌকিক অপকৃষ্ট ধর্ম; তাহার প্রভাবে প্রকৃত সনাতনধর্ম – ম্লেচ্ছেরা যাহাকে হিন্দুধর্ম বলে – তাহা লোপ পাইয়াছে। প্রকৃত হিন্দুধর্ম জ্ঞানাত্মক, কর্মাত্মক নহে। (আনন্দমঠ, অষ্টম পরিচ্ছেদ, ৯২ পৃষ্ঠা, ভারতের কৃষক বিদ্রোহ ও গণতান্ত্রিক সংগ্রাম , তৃতীয় সংকলন কলকাতা, ১৯৮০]।

বঙ্কিম তার লেখা ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসে মুসলমানদের ম্লেচ্ছ, যবন, নেড়ে বলা ছাড়াও মুসলমানদেরকে পাপিষ্ঠ, পাপাত্মা, দুরাত্মা, নরাধম, নরপিশাচ, বানর, অকৃতজ্ঞ, ইতর- এ জাতীয় কোনো গালিই দিতে বাদ দেয়নি।

৪) বঙ্কিম রাজসিংহ উপন্যাসের প্রথম পরিচ্ছেদ : তসবিরওয়ালী পর্বে লিখেন,
প্রাচীনা প্রথম চিত্রখানি বাহির করিলে, এক কামিনী জিজ্ঞাসা করিল, “এ কাহার তসবির আয়ি?”

প্রাচীনা বলিল, “এ শাহজাঁদা বাদশাহের তসবির৷”

যুবতী বলিল, “দূর মাগি, এ দাড়ি যে আমি চিনি। এ আমার ঠাকুরদাদার দাড়ি৷”

আর এক জন বলিল “সে কি লো? ঠাকুরদাদার নাম দিয়া ঢাকিস কেন? ও যে তোর বরের দাড়ি৷” পরে আর সকলের দিকে ফিরিয়া রসবতী বলিল, “ঐ দাড়িতে একদিন একটা বিছা লুকাইয়াছিল–সই আমার ঝাড়ু দিয়া সেই বিছাটা মারিল৷”

তখন হাসির বড় একটা গোল পড়িয়া গেল। চিত্রবিক্রেত্রী তখন আর একখানা ছবি দেখাইল। বলিল, “এখানা জাঁহাগীর বাদশাহের ছবি৷”
[রাজসিংহ : প্রথম খণ্ড : প্রথম পরিচ্ছেদ , বঙ্কিম রচনাবলি ,পৃষ্ঠা ১ ]।

৫) রাজসিংহ উপন্যাসের দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ : চিত্রদলন পর্বে লিখেন-রাজপুত্রী বলিলেন, “আমি এই আল‍মগীরবাদশাহের চিত্রখানি মাটিতে রাখিতেছি। সবাই উহার মুখে এক একটি বাঁ পায়ের নাতি মার। কার নাতিতে উহার নাক ভাঙ্গে দেখি৷”……হাসিয়া রাজপুত্রী চিত্রখানি মাটিতে রাখিলেন “কে নাতি মারিবি মার৷”……..চঞ্চলকুমারী ধীরে ধীরে অলঙ্কারশোভিত বাম চরণখানি ঔরঙ্গজেবের চিত্রের উপরে সংস্থাপিত করিলেন–চিত্রের শোভা বুঝি বাড়িয়া গেল। চঞ্চলকুমারী একটু হেলিলেন–মড় মড় শব্দ হইল–ঔরঙ্গজেব বাদশাহের প্রতিমূর্‍তি রাজপুতকুমারীর চরণতলে ভাঙ্গিয়া গেল।

“কি সর্‍বনাশ! কি করিলে!” বলিয়া সখীগণ শিহরিল। রাজপুতকুমারী হাসিয়া বলিলেন, “যেমন ছেলেরা পুতুল খেলিয়া সংসারের সাধ মিটায়, আমি তেমনই মোগল বাদশাহের মুখে নাতি মারার সাধ মিটাইলাম৷” তার পর নির্‍মলের মুখ চাহিয়া বলিলেন, “সখি নির্‍মল! ছেলেদের সাধ মিটে; সময়ে তাহাদের সত্যের ঘর-সংসার হয়। আমার কি সাধ মিটিবে না? আমি কি কখন জীবন্ত ঔরঙ্গজেবের মুখে এইরূপ__”

নির্‍মল , রাজকুমারীর মুখ চাপিয়া ধরিলেন, কথাটা সমাপ্ত হইল না–কিন্তু সকলেই তাহার অর্থ বুঝিল। প্রাচীনার হৃদয় কম্পিত হইতে লাগিল–এমন প্রাণসংহারক কথাবার্‍তা যেখানে হয়, সেখান হইতে কতক্ষণে নিষ্কৃতি পাইবে! এই সময়ে তাহার বিক্রীত তসবিরের মূল্য আসিয়া পৌঁছিল। প্রাপ্তিমাত্র প্রাচীনা ঊর্দ্ধশ্বাসে পলায়ন করিল” [রাজসিংহ : প্রথম খণ্ড : চিত্রে চরণ, বঙ্কিম রচনাবলি ,পৃষ্ঠা ২]।

বঙ্কিমের রাজসিংহ উপন্যাসের এই একটি উদ্ধৃতি থেকে পরিষ্কার যে, বঙ্কিম তাঁর উপন্যাসে কোনো কারণ ছাড়াই জনৈক হিন্দু মহিলাদের দিয়ে মোগল বাদশাহদের দাড়ি নিয়ে মশকরা করেছেন। হাস্যকর চিত্রের মাধ্যমে বিখ্যাত প্রজা দয়ালু বাদশার মুখে ও নাকে লাথি মেরে নাক মুখ ভাঙ্গা ব্যবস্থা করেছিলেন । এরচেয়ে বড় সাম্প্রদায়িক মুসলিম বিদ্বেষী লেখা আর কি হতে পারে?

৬) মৃণালিনী উপন্যাসে বঙ্কিম লিখেছেন “তুমি দেবকার্য না সাধিলে কে সাধিবে? তুমি যবনকে না তাড়াইলে কে তাড়াইবে? যবন নিপাত তোমার একমাত্র ধ্যান হওয়া উচিত্‍।”

…..”হেমচন্দ্র বিনীতভাবে কহিলেন, “অপরাধ গ্রহণ করিবেন না, দিল্লীতে কার্য হয় নাই। পরন্তু যবন আমার পশ্চাদগামী হইয়াছিল; এই জন্য কিছু সতর্ক হইয়া আসিতে হইয়াছিল। তদ্ধেতু বিলম্ব হইয়াছে। ব্রাহ্মণ কহিলেন, “দিল্লীর সংবাদ আমি সকল শুনিয়াছি। বখ্ই‍তিয়ার খিলিজিকে হাতীতে মারিত, ভালই হইত, দেবতার শত্রু পশুহস্তে নিপাত হইত। তুমি কেন তার প্রাণ বাঁচাইতে গেলে!”

হে। তাহাকে স্বহস্তে যুদ্ধে মারিব বলিয়া। সে আমার পিতৃশত্রু, আমার পিতার রাজ্যচোর। আমারই সে বধ্য।” [ মৃণালিনী, প্রথম খণ্ড, প্রথম পরিচ্ছেদ‍ ২, বঙ্কিম রচনাবলী,পৃষ্ঠা ৮৯] ।

কতটা ‌বি‌দ্বেষ থাক‌লে এমন ক‌রে লেখা যায়! মৃণালিনী উপন্যাসে বখতিয়ার খিলজীকে তি‌নি বলেছেন ’বানর’, ’অরন্যনর’ ইত্যাদি। তিনি স্পষ্টতই বলতেন, ”পরজাতির অমঙ্গল সাধন করিয়া সাত্বমঙ্গল সাধিত হয় তাহাও করিব।”

ব‌ঙ্কিমচন্দ্র বি‌দ্বেষ উগ‌রে লিখ‌লেন –
“আসে আসুক না আরবী বানর
আসে আসুক না পারসী পামর”।

এরপরও মান‌তে হ‌বে ব‌ঙ্কিমবাবু মুস‌লিম বি‌দ্বেষী ছি‌লেন না?

৭) প‌রি‌শে‌ষে ব‌ঙ্কি‌মেচ‌ন্দ্রের লেখা এক‌টি অংশ ‌দি‌য়ে লেখা শেষ কর‌ছি। যেটাতে স্পষ্ট হ‌য়ে‌ছে যে ব‌ঙ্কিমচন্দ্র কতটা নোংরা ম‌নের এবং কত জঘন্যভা‌বে মুস‌লিম বি‌দ্বেষী ছি‌লেন।

“ঢাকাতে দুই চারিদিন বাস করিলেই তিনটি বস্তু দর্শকের নয়ন পথের পথিক হইবে কাক, কুকুর ও মুসলমান। এই তিনটি সমানভাবেই কলহপ্রিয়, অতি দুর্দম, অজেয়।” [আনন্দমঠ, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ, সংক্ষিপ্ত সংকলন, তৃতীয় মুদ্রণ, পৃ ২৩, ১৩৬৪]

তাজমুল ক‌রিম
হাওড়া

কৃতজ্ঞতা স্বীকার – সূ‌ফি বরষণ