পাঠকের কলমে, টিডিএন বাংলা :  গতকাল মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের ‘স্ট্যাচু অব ইউনিটি’ মূর্তি স্থাপন করেছেন গুজরাটের নর্মদা জেলার সাধু বেট দ্বীপে। যা বিশ্বে নয়া রেকর্ড গড়ল। পৃথিবীর সর্বোচ্চ মূর্তি (উচ্চতা ১৮২ মিটার) পাওয়ার শিরোপা পেল ভারত। একজন ভারতীয় হিসাবে আমরা অবশ্যই গর্বিত। পৃথিবীবাসী দেখবে ভারতে দাঁড়িয়ে উচ্চতম মূর্তি। কিন্তু এর পিছনের কালো গাঢ় অন্ধকার তাদের চোখে পড়বে না।

তারা কি দেখতে পাবে আদিবাসীদের কিভাবে তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে, তাদের অস্তিত্বকে বিপন্ন করে এই মূর্তি স্থাপন করা হয়েছে? যে দেশে অর্ধেকের বেশি মানুষ দিনে দু-বেলা অন্ন জোটাতে পারে না, সে দেশে একজন রাজনৈতিক ব্যক্তির মূর্তির জন্য প্রায় ৩০০০ কোটি টাকা ব্যয় করা বিলাসিতা ছাড়া অন্য কিছু না।

ভারতের আধুনিক উন্নয়নের ইতিহাসে এটি একটি কালো অধ্যায়। এই মূর্তি স্থাপনের পিছনে কাহিনীতে
যাওয়া যাক। এমন বলার কারণ গুলি হল-
১.ভূমি অধিগ্রহণের সময় বিরোধিতা করা হলে এটা আদিবাসীদের উন্নয়ন বলে গণ্য করা হয়। আদিবাসীদের বিরোধীতা সত্ত্বেও, গুজরাট সরকার এই প্রকল্পে এগিয়েছে। গুজরাটের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীও সুরেশ মেহতা এই প্রকল্পের বিরোধিতা করেন। তবুও ১৯৯৬ আইন  লঙ্ঘন করে এটি স্থাপন করা হয়।

২.গুজরাট সরকার এই প্রকল্পের জন্য পরিবেশ অনুমোদন অর্জন করেনি। দেশের ৫০ টি পরিবেশবাদীরা দেশের বন, পরিবেশ ও জলবায়ুর স্বার্থে প্রকল্পটির প্রতিবাদ করে।

৩.এই প্রকল্প পরিবেশ সুরক্ষা আইন (১৯৮৬) লঙ্ঘন এবং আদালতের আদেশ  উপেক্ষা করে। শুধু বিজেপি সরকার এটি করে নির্বাচনে সুবিধা পেতে।

৪.মূর্তি নির্মাণের জন্য আদিবাসীদের ঘর-দোর, কৃষিজমি ও সাথে সাথে তাদের ধর্মস্থান জলে ডুবে গেছে।

৫.অধিকৃত জমির জন্য ক্ষতিপূরণ প্রদান করেনি সরকার। ফলে আদিবাসীদের আন্দোলন করে। তা দেখে গুজরাট সরকার তাদের দাবি পূরণ করার প্রতিশ্রুতি দেয়। কিন্তু পূরণ করতে অসফল।

৬.নরেন্দ্র মোদী তাঁর বক্তৃতায় বার বার আদিবাসীদের কথা তুলে ধরেছেন। কিন্তু বাস্তবতা ঠিক এর বিপরীত। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর তিনি নর্মদা বাঁধের উচ্চ উচ্চতা বৃদ্ধি করার সিদ্ধান্ত নেন, যা আদিবাসীদের জমি ডুবিয়ে দেয়। তিনি আদিবাসীদের জমি দিতে বাধ্য করেছেন।

একজন মহান ব্যক্তিকে সম্মান প্রদর্শন করার জন্য সাধুবাদ জানাই। কিন্তু এর বিকল্প কোনো উপায় ছিল না? দেশের একাংশদের (কৃষক ও আদিবাসী) চরম ক্ষতি করে, সন্তুষ্ট করে মূর্তি স্থাপন করা যায় না। আদিবাসীরা কি দেশের ঐক্য ও শুদ্ধতার অংশ নয়? গুজরাট সরকার আদিবাসীদের জমি কেড়ে তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে এই কাজ করেছে। যাতে ক্ষতিগ্ৰস্ত হয়েছে ৭২ টি গ্ৰাম আর ৭৫,০০০ আদিবাসী। তাদের জমিতে সেচের জল নেই, তার সমাধান করে নি সরকার। তাই ক্ষোভে উত্তাল আদিবাসী সমাজ। বিশ্বে এই প্রথম কোনও প্রধানমন্ত্রীর পোস্টার রক্ষার্থে পুলিশকে পাহারায় বসতে হয়েছে।

মূর্তি নির্মাণে এই বিপুল টাকা ব্যয় করে সমালোচিত হয়েছে সরকার। আমাদের বিদ্যালয় নেই, হাসপাতাল নেই, পানীয় জলের ব্যবস্থা নেই, তিন হাজার কোটি টাকা খরচ করে তৈরি হয়েছে কংক্রিটের মানবদেহ! বুদ্ধিজীবীদের মতে, এই অর্থরাশি অন্যান্য জনকল্যাণকর কাজে ব্যবহার করা যেত। যেমন: কৃষির জন্য সেচ প্রকল্প, আইআইএম ক্যাম্পাস, অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অব মেডিক্যাল সায়েন্সের (এইমস) ক্যাম্পাস, নতুন সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্প, নতুন আইআইটি ক্যাম্পাস, উন্নত মানের স্টেডিয়াম ও স্পোর্টস একাডেমী খোলা, উন্নত মানের কলেজ প্রতিষ্ঠা, দেশের বিভিন্ন প্রান্তরে উন্নত মানের হাসপাতাল স্থাপন ইত্যাদি অনেক কিছুই করা যেত। যাতে দেশ ও দশের কল্যাণ সাধিত হত। কিন্তু এতে সরকারের বিচক্ষণতার অভাব পরিস্ফুট হয়েছে। তাই মনে হয় এটা সেই ইতিহাসের ‘পাগলা রাজার’ মতোই একখানি সিদ্ধান্ত।

সুরাইয়া খাতুন
উস্থি, দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা