সালমা খাতুন, টিডিএন বাংলা : আজ ১ লা ফেব্রুয়ারি। ২০১৩ সাল থেকে বিশ্বজুড়ে এই দিনটিতে পালিত হয়ে আসছে “বিশ্ব হিজাব দিবস” হিসেবে।বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত নিউ ইয়র্কের বাসিন্দা নাজমা খান প্রথম ইন্টারনেট ভিত্তিক সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোতে হিজাব দিবস পালনের আহ্বান জানান। নাজমার সেই আহ্বানে প্রভাবিত হয়ে মুসলিম- অমুসলিম নির্বিশেষে সকল নারী ২০১৩ সালের ১ লা ফেব্রুয়ারি হিজাব দিবস পালনে এগিয়ে আসে। উল্লেখ্য নাজমা খান মাত্র ১২ বছর বয়সে নিউইয়র্কে আসেন বাংলাদেশ থেকে।

হিজাব দিবস পালনের প্রেক্ষাপট হিসেবে নাজমা জানান, তিনি যখন স্কুলে হিজাব মাথায় দিয়ে যেতেন তখন তাকে ব্যাটম্যান ও নিনজা বলে ডাকা হত। বহু অপমান ও লাঞ্ছনার শিকার হতে হয়। এমনকি ৯/১১’র পর তাকে লাদেন বা সন্ত্রাসী বলেও ডাকা হতো। তিনি আরও জানান, হিজাবকে সাধারণত এখানে নারীর প্রতি নিপীড়ন ও বৈষম্যের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়, আর এই বৈষম্যকে উৎখাত করতেই সকল বোনদের কাছে হিজাব দিবস পালনের আহ্বান জানিয়েছিলেন তিনি। বিশ্বের সর্ব ধর্মের নারীরা তার সেই আহ্বানে অভূতপূর্ব ভাবে সাড়া দিয়েছিলেন‌।

হিজাব এর বাংলা প্রতিশব্দ পর্দা এবং এর শাব্দিক অর্থ প্রতিহত করা, আড়াল করা, গোপন করা, বাধা দান করা ইত্যাদি। ইসলামে পর্দার বিধান দেওয়া হয়েছে নারীদের বিভিন্ন নিগ্রহের কবল থেকে রক্ষার উদ্দেশ্যে।এক্ষেত্রে প্রশ্ন উঠতে পারে, পর্দানশীন মহিলারা কী ধর্ষণ বা শ্লীলতাহানির শিকার হন না? কিন্তু পরিসংখ্যান দেখলে বোঝা যাবে, নিগ্রীহিতাদের মধ্য স্বল্পবসনা নারীর থেকে পর্দানশীন নারীর সংখ্যা অত্যন্ত নগন্য। হিজাব মূলত মুসলিম নারীরা ব্যবহার করলেও বর্তমান বিশ্বের অনেক অমুসলিম মহিলারাও এটি ব্যবহার করে।

মুসলিম মহিলারা পর্দা বা হিজাব ধর্মীয় কারণে করলেও আজকাল অনেক অমুসলিম মহিলারাও ফ্যাশন হিসাবে এর ব্যবহার করে থাকেন।এছাড়া অনেকে নিজের ত্বক ও চুলকে সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি থেকে বাঁচাতে হিজাব পরে। আর চিকিৎসকরাও আজকাল ধুলোবালি, সূর্যের প্রখর তাপ থেকে ত্বক ও চুলকে রক্ষা করতে ঢেকে রাখার পরামর্শ দেন। আশ্চর্য হলেও সত্য, যেটি বর্তমানে চিকিৎসা বিজ্ঞান বলছে সেটি আজ থেকে ১৪০০ বছর আগে সৃষ্টিকর্তার নির্দেশে হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) প্রচলন করে গিয়েছেন।

আধুনিক বিশ্বে সুশিক্ষিত, প্রগতিশীল মানুষ মনে করেন, পর্দা মহিলাদেরকে ক্ষুদ্র পরিসরে আবদ্ধ করে রেখেছে। ধর্মীয় বিধি-নিষেধ এর ফলে মুসলিম মহিলারা গৃহের চৌহদ্দির মধ্যেই আটকে আছে। তাদের মধ্যকার প্রতিভা বিকশিত করতে পারছে না। ‘কিন্তু পর্দা যে প্রগতির পথে অন্তরায় নয়’ তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ ইয়েমেনের পর্দানশীন নারী তাওয়াক্কুল আব্দেল সালাম কারমান।

তিনি একাধারে সাংবাদিক, রাজনীতিক, মানবাধিকারকর্মী। ২০০৫ সালে তিনি “উইমেন জার্নালিস্ট উইথ আউট চেইন্স” নামক নারী সাংবাদিকদের একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন এবং এর নেতৃত্ব দেন। ২০১১ সালের ইয়েমেন বিদ্রোহের সময় তিনি আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিতি লাভ করেন। তিনি অভিহিত হন “লৌহমানবী” ও “বিদ্রোহের মাতা” হিসাবে। এছাড়াও ২০১১- তে দ্বিতীয় মুসলিম নারী ও দ্বিতীয় সর্বকনিষ্ঠ ব্যক্তি হিসেবে নোবেল শান্তি পদক লাভ করেন। তাঁর পর্দা তাঁর সুখ্যাতি, প্রগতির পিছনে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়নি।

সম্প্রতি মার্কিন কংগ্রেসের সদস্য হিসেবে হিজাব পরেই শপথ নিয়েছেন সোমালিয়া বংশোদ্ভূত ওমর ইলহান। প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার উপদেষ্টা ডক্টর ডালিয়া মুজাহিদ ছিলেন একজন হিজাব পরিহিতা নারী। তার শালীন পোশাক পরিধান সম্পর্কে একবার সাংবাদিকরা তাকে গভীর বিষয়ে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘আপনার বেশ-ভূষার মধ্যে আপনার উচ্চ শিক্ষা ও জ্ঞানের গভীরতা প্রকাশ পাচ্ছেনা’।

তাদের ধারণা ছিলো হিজাব অনগ্রসরতা ও সেকেলে ধ্যান-ধারণার প্রতীক। উত্তরে তিনি বলেন,” আদিম যুগে মানুষ ছিল প্রায় নগ্ন। শিক্ষা ও জ্ঞান চর্চার সাথে সাথে পোশাক পরিধান করে সভ্যতার উচ্চ শিখরে আরোহণ করতে থাকে। আমি যে পোশাক পড়েছি তা শিক্ষা ও চিন্তাশীলতার উন্নতি ও সভ্যতার চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ। নগ্নতা ও উলঙ্গপনাই যদি উন্নত শিক্ষা ও সভ্যতার চিহ্ন হতো, তাহলে বনের পশুরাই হতো পৃথিবীর সবচেয়ে উন্নত ও সুসভ্য।

মিশরের ৩০ বছরের স্বৈরাচারী শাসক হোসনি মোবারকের বিরুদ্ধে সোশ্যাল মিডিয়ায় আন্দোলনের ডাক দিয়েছিলেন একজন হিজাব পরিহিতা নারী, ‘আসমা মাহফুজ’। তার ছোট ঢেউ পরবর্তীতে রূপ নিয়েছিল উত্তাল তরঙ্গের। হিজাব পরেও সফল পাকিস্তানের নিউরো সাইন্টিস্ট ডঃ আফিয়া সিদ্দীকা।সফল আর এক নারী ইয়াসমিন মোজাহেদ, মনোবিজ্ঞানে স্নাতক, সাংবাদিক এবং গণ যোগাযোগের উপর মাস্টার ডিগ্রি অর্জন করেছেন।

এছাড়াও মিশরের জয়নাব আল গাজ্জালী, মারিয়াম জামিলা, ওমর সুলাইমান, পাকিস্তানের পাইলট শাইনাজ লাগহারি প্রমুখরা আপাদমস্তক ঢাকা ধর্মীয় পোশাক পরিধান করেও নিজ নিজ ক্ষেত্রে চূড়ান্তভাবে সফল। আমরা মুসলিম বিশ্বের প্রতিটা দেশের দিকে লক্ষ্য করলে দেখতে পাবো, নারীরা হিজাব পড়েই পার্লামেন্ট, ব‍্যবসা-বানিজ‍্য, কর্মসংস্থান, এককথায় দেশের প্রতিটি বিভাগেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। এরপর ও সুশীল সমাজ প্রগতিবাদীরা কি বলবেন- পর্দা প্রগতির অন্তরায়?

যেদিন বিশ্ব হিজাব পরিহিত নারীদের দেখে তির্যক দৃষ্টি না হেনে, কটাক্ষ না করে, বৈষম্য না করে, তাদের যথাযোগ্য সম্মান দেবে, যেদিন তারা মানবে যে পর্দা নারীর বিকাশের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায় না। সেদিনই সার্থক হবে ‘নাজমা খান’-এর ক্ষুদ্র প্রয়াস। সার্থক হবে “বিশ্ব হিজাব দিবস”।

রাজারহাট, নিউটাউন
উত্তর চব্বিশ পরগনা

Advertisement
mamunschool