সমীরণ খাতুন, টিডিএন বাংলা :খুব সকালে বাজারে পড়ে থাকা সবজি কুড়াতে এসেছিলো দুই ভাইবোন। ছোট্ট বোন মুনিয়া, রাস্তার মোড়ে দোকানে রঙ বেরঙের মোড়কে সুসজ্জিত কেকগুলি দেখে দাদার কাছে বায়না ধরলো, সেই কেক তার চাই। দশ বছরের দাদা সরফরাজ ঠিক করলো বোনের ইচ্ছা সে পূরণ করবে যে কোন প্রকারে। বোনকে বললো তুই বাড়ি যা, মাকে কেকের কথা কিছু বলিস না। তারপর সে চললো ইঁটভাটার দিকে। তার মা যে বড়ো দুঃখী, সরফরাজের মনে পড়লো পুরানো দিনের কথা। আব্বু আর আম্মি যখন দুজনে কাজ করতো ইঁট ভাটায় তখন ওরা দুবেলা পেট ভরে ভাত খেতে পেতো। কিন্তু গতবছর তো আব্বু দেশে গিয়ে আবার বিয়ে করেছে, আর ফিরবেনা কোনদিন। সেই চিন্তায় মা অসুস্থ হয়ে পড়লো। সে বাধ্য হল কাজ করতে। প্রথম প্রথম গা ব্যথায় টনটন করতো। ছোট্ট মাথায় খুব কষ্ট হতো। চোখের পানি গড়িয়ে পড়তো। কিন্তু উপায় তো কিছু নেই তার।


আম্মু তাকে স্কুলে ভর্তি করে দিয়েছিলো। সেখানে সাহিদের সাথে তার খুব বন্ধুত্ব হয়েছিলো। আজও তার কথা মনে পড়ে। আম্মু কাঁদতে কাঁদতে বলেছিলো, ভেবেছিলাম ছেলেমেয়ে দুটোকে লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষ করবো। হায় আল্লাহ গরীবের স্বপ্ন দেখা মানায় না গো!
সরফরাজ আজ ওভারটাইম কাজ করলো। অনেক রাতে মজুরির টাকা পেল মাত্র দেড়শো টাকা। তারপর হন্তদন্ত হয়ে ছুটলো কেকের দোকানে, পাছে দোকানটি বন্ধ হয়ে যায়। একটা ছোট কেকের দাম জানতে চাইলে দোকানি বললো, যা এখান থেকে দুবেলা ভাত জোটেনা। সে কিনতে এসেছে কেক! সরফরাজ পকেট থেকে একটা একশো ও পাঁচটি দশ টাকার নোট বার করলো। তাই দেখে দোকানি বললো, একশো কুড়ি টাকা। সরফরাজ টাকা মিটিয়ে কেকটি নিয়ে বাকি ত্রিশ টাকার মায়ের ওষুধ নিয়ে ঘরে ফিরলো।

ছেলের ফিরতে দেরি হতে দেখে মা বারান্দায় বসে ছিল চিন্তিত হয়ে। সরফরাজের হাতে কেকের প্যাকেট দেখে মা চিৎকার করে বললো, কোথায় পেলি? চুরি করিসনি তো? চাল আলু কোথায়? চিৎকার শুনে ছোটবোন ঘুম থেকে উঠে এসে বললো, ভাইজান কেক এনেছিস? ভাইয়ের হাত থেকে কেকের প্যাকেটটি নিয়ে সে খুলতে লাগলো। সরফরাজ বললো, আম্মু গরীবের সংসারে একদিন অনাহারে থাকলে কি আর এমন হবে! বোনের মুখের হাসি কিনতে আজ আমি ওভারটাইম কাজ করেছি। তাই ফিরতে লেট হয়েছে। আমরা গরীব তবুও তোমার শিক্ষা মাথায় রেখে কোনদিন চুরি করিনি আম্মু। গর্বে মায়ের বুক ভরে উঠলো। দুই ছেলেমেয়েকে বুকে টেনে নিয়ে মা কাঁদতে কাঁদতে বললো, গরীবের সংসারে যাদের দুবেলা ভাত জোটেনা তাদের কেক খাওয়াটা বিলাসিতা বাবা। এমন ভুল আর করোনা। বড়োদিনের আলো, উপহার, কেক এসব বড়োলোকদের জন্য।